মোঃ জাহিদুর রহমান সোহাগ দাকোপ।।
শষ্য ভান্ডার খ্যাত খুলনার দাকোপে এবছর দ্বিগুণের বেশি জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। তবে সেচের পানির চরম অভাব থাকলেও তরমুজের ফলন হয়েছে বাম্পার। প্রথম দিকে অল্প কিছু সংখ্যক কৃষক দামও পেয়েছেন ভালো। কিন্তু বর্তমানে তরমুজের অস্বাভাবিক দর পতনে এলাকার হাজারো কৃষক ব্যাপক লোকসানে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ফলে ক্রেতা সংকটে পূঁজি বাচাতে মরিয়া হয়ে অধিকাংশ কৃষক মাল নিয়ে ছুটছেন দেশের বিভিন্ন মোকামে।
এলাকাবাসি ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলের প্রধান ফসল আমনের পর রবি মৌসুমে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় তরমুজ চাষে। এবছর ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় মোট তরমুজ চাষ হয়েছে ৭ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে। গত বছর চাষ হয়েছিল ৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে। এছাড়া বোরো ধান ২১৫ হেক্টর, তিল ৩ হেক্টর, মুগডাল ৪ হেক্টর, ভূট্টা ৮ হেক্টর, বাঙি ১৫ হেক্টর ও অন্যান্য শাক সবজি ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। তবে প্রচন্ড খরা ও বৃষ্টি না হওয়ায় পানির উৎস খাল ও পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় তরমুজ ক্ষেতে চরম সেচ সংকট থাকার পরও ভালো ফলন হয়েছে বলে এলাকার একাধিক কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে। প্রথম দিকে অল্প কিছু সংখ্যক কৃষক প্রতি ৩৩ শতক বিঘার ক্ষেত ১ থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করলেও বর্তমানে তা বিক্রি করতে হচ্ছে পানির দরে অর্থাৎ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায়। তরমুজের অস্বাভাবিক দর পতনে এলাকার হাজারো কৃষক ব্যাপক লোকসানে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ স্থানীয় দালাল, ফড়িয়া ও পরিবহন সিন্ডিকেট, দুইটি ফেরীঘাটে যানযটে ট্রাকের দীর্ঘ লাইন এবং ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণে এমন দর পতন হয়েছে। ফলে ক্রেতা সংকটে পূঁজি বাচাতে মরিয়া হয়ে অধিকাংশ কৃষক মাল নিয়ে ছুটছেন ঢাকা, গাজিপুর, বগুড়া, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জনসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে। কিন্তু মোকামে মাল বিক্রির পর অনেকেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। অনেকে আবার বিপাকে পড়ে বাড়ি থেকে উল্টে বিকাশে টাকা নিয়ে ট্রাক ভাড়া ও আড়তদারের কমিশন মিটিয়ে ফিরছেন।
আমতলা এলাকার স্থানীয় মেম্বর কৃষক জয়ন্ত কুমার গাইন জানান, দুই ভাই মিলে ১৯ বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। এতে তাদের প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রথমে তিনি ১৩ বিঘা জমির তরমুজ বিক্রি করেছেন ১৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়। এখনো ৬ বিঘা জমির ক্ষেত বিক্রি করতে বাকি আছে। তবে দাম কমে যাওয়ার কারণে এখনো কোন ফড়িয়া ক্ষেতটির দাম বলেনি। এই ক্ষেতটিতে তাদের লোকসান বলে ধারণা করছেন। তিনি বলেন সেচের পানির চরম সংকটের পরও অধিকাংশ কৃষকের ফলন ভালো হয়েছে। তবে স্থানীয় দালালদের কারণে কৃষকরা দাম কম পাচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।
পানখালী এলাকার ফাল্গুনী হালদার, বিপ্রদাস ঘোষসহ একাধিক কৃষক বলেন, এনজিও থেকে লোন নিয়ে তারা তরমুজ চাষ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তরমুজের অস্বাভাবিক দর পতনের কারণে এখনো পর্যন্ত কোন ফড়িয়া তাদের ক্ষেতের দাম বলেনি। উল্টে বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে পরিবহনের ভাড়া ও আড়তদারের কমিশন মিটানোর ভয়ে বাহিরের মোকামে মাল নিয়ে যেতে পারছেন না। তরমুজ চাষে ব্যাপক লোকসানে এখন কিভাবে এনজিওর লোন পরিশোধ করবেন এবং পরিবার পরিজন নিয়ে কি খেয়ে বাঁচবেন এই দুরচিন্তায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
চালনা এলাকার বাসুদেব মন্ডল জানান, তারা দুইজনে মিলে ৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলেন। এতে তাদের প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা খরচ হয়। এক দালালের কথামত কয়েকদিন আগে বিক্রির জন্য মাদারিপুরের ভোরঘাটা মোকামের এক আড়তে নিয়ে যান। সেখানে ৫ হাজার পিচ তরমুজ নিতে দুই ট্রাকের ভাড়া হয়েছে সাড়ে ৩৮ হাজার টাকা। মাল বিক্রি করেছেন ৪২ হাজার ৪৩০ টাকার। উল্টে আড়তদার ট্রাক ভাড়া ও কমিশনসহ ৪৬ হাজার ২৯৩ টাকা পাবে বলে জানালে তারা অনুরোধ করে হাতে পায়ে ধরে ১ হাজার টাকা চেয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে জানান।
কৈলাশগঞ্জ এলাকার সাবেক মেম্বর কৃষক সিন্ধু রায় বলেন, এবার অধিকাংশ কৃষকের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ফড়িয়াদের সিন্ডিকেট, স্থানীয় দালালদের দৌরাত্ব, ফেরী ও খেয়াঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায় এবং ঘাটে যানযটে ট্রাকের দীর্ঘ লাইনের কারণে তরমুজের দর পতন হয়েছে। যে কারনে ক্রেতা সংকটে পূঁজি বাচাতে অধিকাংশ কৃষক এখন মাল নিয়ে ছুটছেন ঢাকা, বরিশাল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে। ফলে তরমুজ ক্ষেত বিক্রি করতে না পেরে লোকসানের আশংকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকরা।
স্থানীয় ফড়িয়া জয়নগর এলাকার হাফিজুর রহমান জানান, মূলত আম ও লিচু বাজারে আসার কারণে তরমুজের দাম কমে গেছে। তাছাড়া পরিবহনের অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে এলাকায় বাহিরের ব্যাপারী বেশি না আসায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় তরমুজ অনেক বেশি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান বলেন, সেচের পানি সংকটের পরও ফলন ভালো হয়েছে। করোনা মহামারির কারণে যাদের চাকুরী নাই তারাও এবার তরমুজ চাষ করেছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। তাছাড়া উত্তরবঙ্গে তরমুজের একটা বড় চালান যেতো। সেখানেও এবার তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে। মালের কোয়ালিটিও এখানকার চেয়ে অনেক ভালো। সেখানকার পাইকারি ব্যাপারীও এখানে আসছে না। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো না হওয়ায় পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এছাড়া আম, লিচু বাজারে আসলে তরমুজ কম চলে। ফলে বিভিন্ন কারণে তরমুজের দর পতন হয়েছে। কৃষকদেরও নিজেদের ইচ্ছামত উৎপাদন খরচ না করে কমাতে হবে। পাশাপাশি কম জমিতে চাষ করতে হবে। বিশেষ করে ফাল্গুণ মাসের ১০ তারিখের পর আর চাষ বা বীজ বপন করা যাবে না। তাহলে কৃষকরা ভালো দাম পাবেন বলে তিনি মনে করেন।











































