Home আঞ্চলিক কৃষকের স্বপ্ন ডুবেছে পানিতে

কৃষকের স্বপ্ন ডুবেছে পানিতে

10

সাবজাল হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি ॥

নিম্ন  চাপের প্রভাবে গত ৩ দিন চলেছে থেমে থেমে বৃষ্টি। যা মাঠভরা পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। কেননা এ এলাকার অধিকাংশ পাকা আমনের ক্ষেত এখন কাঁদা পানিতে একাকার। এভাবে কয়েকদিন থাকলে খরচের টাকাও আসবেনা। কোন ক্ষেতের ধান বৃষ্টির আগেই কেটে গোখাদ্যের জন্য রয়েছে ফেলিয়ে রাখা। আবার কোন ক্ষেতের ধান না কাটলেও বৃষ্টি বাতাসে মাটিতে নুয়ে পড়ে এখন পানির নীচে। তবে কিছু ক্ষেত ভালো থাকলেও কেটে ঘরে তোলা জরুরী। ক্ষেতের ধান নিয়ে এমন বেকায়দায় সকল আমন চাষিই। এমন অবস্থায় সবারই শ্রমিক দরকার। তাইতো কৃষি শ্রমিক নিয়ে কাড়াকাড়িতে শ্রমিক বেচাকেনার হাটে চলছে উপচে পড়া ভীড়। প্রয়োজনে কৃষি শ্রমিক যেন হটকেক। কেননা যে যার মত বেশি মজুরী দিয়ে শ্রমিক আয়ত্বে নিচ্ছেন। আবার বাজার গরমের এ সুযোগ  কাজে লাগিয়ে  শ্রমিকেরাও ইচ্ছামত মজুরী হাকিয়ে নিচ্ছেন। এমন অবস্থা বিরাজ করছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের শ্রমিক বেচাকেনার হাটে।

সরেজমিনে সোমবার সকালে কালীগঞ্জ শহরের শ্রমিক বেচাকেনার হাটে গেলে দেখা যায়, বিভিন্ন জেলা থেকে কাজের সন্ধ্যানে আসা কৃষি শ্রমিকেরা অপেক্ষা করছেন। তাদের সাথে রয়েছে শীতের পোশাকের ব্যক্তিগত ব্যাগ বা পুটলা। তাদের আশা একটু বেশি দামে কেউ কিনে তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে যাবেন। মিলবে তাদের কাজের নিশ্চয়তা। আবার আমনচাষীরাও শ্রমিক নিতে ব্যস্ত থাকছেন। মনে হলো বেশি দামে শ্রমিক নিতে কৃষকদের মাঝে যেন অলিখিত পাল্লা চলছে। আবার উপজেলার  বিভিন্ন মাঠে গেলে দেখা যায়, কয়দিনের বৃষ্টি বাতাসে ক্ষেতের বাইল ভারী সব ধান গাছ মাটিতে শুয়ে পড়েছে। অসময়ের বৃষ্টিতে নিচু মাঠের জমিগুলোতে আরও বেগতিক অবস্থা। অনেক ধান গত তিনদিনের চারা বের হতে শুরু করেছে। আর অপেক্ষাকৃত একটু উচু জমির ধান এখনও রোদ হলে বাঁচানো সম্ভব। কারনেই কৃষি শ্রমিক টানতে কৃষকদের এতো চেষ্টা।

কালীগঞ্জের ফয়লা গ্রামের বর্গাচাষী তোতা মিয়া জানান, এবছর ২ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে মাঠে ধান চাষ করেছিলেন। জমিগুলো একটু নিচু মাঠে হওয়ায় ক্ষেতের সব পাকাধান কাঁদা বৃষ্টিতে একাকার হয়ে গেছে। এখন জমির মালিকের টাকাই পরিশোদ করা কঠিন। সারাবছর ছেলেমেয়েদের নিয়ে কি করে সংসার চালাবো সে চিন্তায় আছি। নরেন্দ্রপুর গ্রামের আরেক বর্গাচাষী মনজের আলী জানান, মাঠে নিজের কোন চাষযোগ্য জমি নেই। মাঠের রাকিবুল ইসলাম ও বল্টু মিয়ার ৩ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে সারা মৌসুম ক্ষেতে কাজ করেছি। ক্ষেতে ধানও হয়েছিল ভালো। কিন্ত গত কয়দিনের অসময়ের বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন না খেয়ে মরতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষেতের ধান বাঁচাতে হলে দ্রুতই ভেজা ধান শুকাতে হবে। সে জন্য ভেজা ধান ক্ষেতে পানি থেকে উঠিয়ে অপেক্ষাকৃত উচু স্থানে রাখতে হবে। কিন্ত প্রতিবছর মৌসুমে মহেশপুর, পাবনা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়াসহ কয়েকটি জেলা থেকে শ্রমিক হাটে আসেন কাজের আসায়। বছরও পালে পালে অতিথি শ্রমিক আসছেন কিন্ত শ্রমিক নিয়ে চলছে কাড়াকাড়ি। মজুরীও হাঁকিয়ে নিচ্ছেন ইচ্ছো মত।

জামাল ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া জানান, বছর মোট ১৬ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছিলেন। এরমধ্যে অতিথি কৃষি শ্রমিক যারা পাবনা থেকে এসেছে তাদের দিয়ে বৃষ্টির আগে ১৪ বিঘা ধান কেটে জমিতে ফেলানোর পরের ওই দিনই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শুধু তার একার নয় ওই গ্রামের অধিকাংশ কৃষকই ক্ষেতের ধান গোখাদ্য বিচালী খড়ের জন্য শুকাচ্ছিলেন। কিন্ত তা তো হলেই না বরং  ধান পানির মধ্যে থেকে কলিয়ে নষ্ট হচ্ছে। আর গোখাদ্যের মুল্যবান বিচালী তো হলেই না উল্টো পঁচে গলে নষ্ট হচ্ছে।

সাদিকপুর গ্রামের আমনচাষী সাজেদুল ইসলাম জানান, মোট ১১ বিঘা আমন ধানের মধ্যে মাত্র ৪ বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি ধান ক্ষেতের পানির ভরা মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। তিনি আরও জানান, এ মৌসুমের আমন ধানের বিচালী বা খড় অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিবিঘা জমির বিচালী এখনই বিক্রি হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন থেকে ৪ হাজার টাকা। কিন্ত বৃষ্টি পানিতে ধান ও বিচালী উভয়ই চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবস্থা এমন এবার মানুষ হয়তো ধারদেনা করে বাঁচতে পারবে কিন্ত কৃষকের সম্পদ গোবাদি পশু কিভাবে বাঁচবে। তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির আগে কৃষি শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল কিন্ত বৃষ্টির পরে কৃষি শ্রমিক মেলানোই যাচ্ছেনা। আর আগের চেয়ে মজুরীও আকাশ সমান। প্রতি শ্রমিক এখন মজুরী চাচ্ছেন ৮’শ টাকা। আবার শ্রমিক বেচাবেচাকেনার হাটেও সবাই ধান বাঁচাতে শ্রমিক নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন।

ফলে এখন হিসাব করে দেখা যাচ্ছে  ধান তোলা, বাড়িতে আনা, মেশিনে ধান ঝাড়ার জন্য শ্রমিকদের মজুরী , সার কীটনাশকের টাকা দিলে আর কিছুই থাকছে না। অনেক ক্ষেতের মালিককে খরচ মেটাতে গাঁটের টাকা দিয়ে পুরন করতে হবে। কিন্ত এভাবে কতদিন।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসসূত্রে জানাগেছে, চলতি আমন মৌসুমে এ উপজেলার ধানচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫’শ হেক্টোর। কিন্ত চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৭’শ ৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২’শ ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ জমির ধান কৃষকেরা ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকিটা ক্ষেতের ধান নিয়ে চরম বেপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।