Home Lead মহানগরে এক সপ্তাহে তিন হত্যা, ৫ কোপাকুপি: নেপথ্যে মাদক-আধিপত্য

মহানগরে এক সপ্তাহে তিন হত্যা, ৫ কোপাকুপি: নেপথ্যে মাদক-আধিপত্য

71


সৈয়দ রানা কবীর।।
খুলনায় ব্যাপকভাবে বেড়েছে খুন, হামলা ও অস্ত্রবাজির ঘটনা। এতে রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষও উদ্বীগ্ন হয়ে পড়েছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই ৩টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ছুরিকাঘাত, কুপিয়ে ও গুলিতে গুরুতর জখম করা হয়েছে ৫ জনকে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত নগরীতে ৩২ টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে ছিল ১৯ টি হত্যাকাণ্ড। অভিযোগ উঠেছে, মহানগরীসহ আশপাশের এলাকায় মাদক কারবার নিয়ে পরস্পর বিরোধী গ্রুপগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে এসব ঘটনা ঘটেছে।
একাধি পুলিশ কর্মকর্তা সুত্রে জানাগেছে, মাদক-সংক্রান্ত বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও নারী ঘটিত কারণে বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার ১২টি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদক, নারী ঘটিত ও সন্ত্রাসী গ্রুপের আধিপত্যের বিরোধ পাওয়া গেছে। এছাড়াও ইজিবাইক ও ভ্যান চুরি নিয়ে পাঁচ হত্যাকাণ্ড, প্রেমের বিরোধে পাঁচ, পারিবারিক কলহে তিনটি হত্যাকাণ্ড, নদীতে ভেসে আসে দুটি লাশ, চুরি দেখে ফেলায় একজন, গণপিটুনিতে একজন এবং অন্যান্য কারণে তিনজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও পুলিশ জানায়, গত ১ আগস্ট রাতে নগরীর সবুজবাগ এলাকায় ঘরে ঢুকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয় মনোয়ার হোসেন টগরকে। পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত ৩ আগস্ট নগরীর মহেশ্বরপাশা উত্তর বণিকপাড়া এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ঘের ব্যবসায়ী আলামিন হাওলাদারকে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে দুর্বৃত্তরা তার গলা কেটে ফেলে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই আওলাদ হোসেন বাদি হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। এই মামলায়ও এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
গত ৫ আগস্ট রাত ৮টায় নগরীর সঙ্গীতা সিনেমা হলের সামনে নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) নেতা শেখ শাহাদাত হোসেনকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রায় ২৩ বছর কারাভোগের পর গত ৮ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান তিনি। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাসহ অসংখ্য মামলা ছিল। মুক্তির পর তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারাদেশের মতো খুলনায় পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় তারা। এ সুযোগ নিয়েছে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিরা। অনেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফিরে আগের অপরাধে জড়িয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে উঠতি সন্ত্রাসীরা। দিন দিন সবাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তবে খুলনার নাগরিক নেতাদের দাবি খুলনার পুলিশের ভেতরে এখনো অধিকাংশ কর্মকর্তা রয়েছে সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর। যাদের নিস্ক্রিয়তা ও সন্ত্রাসীদের প্রশয় দেয়ার অভিযোগ করেন তারা।
আলোচিত ১০টি খুনের এজাহার বিশ্লেষণ ও তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরীতে সশস্ত্র মহড়া, মাদক-সংক্রান্ত গণ্ডগোল ও হত্যাকাণ্ডে তিনটি সন্ত্রাসী বাহিনী জড়িত। এর মধ্যে রংমিস্ত্রি সোহেল, গোলাম হোসেন ও মনোয়ার হোসেন টগর হত্যাকাণ্ড, পঙ্গু রাসেল হত্যায়, অর্ণব হত্যা ও পলাশ যৌথ এবং আমিন মোল্লা বোয়িং হত্যাকাণ্ডে কয়েকটি গ্রুপের সদস্যরা জড়িত। এ ছাড়া তদন্তে বড় শাহীন ও মাহাবুব হত্যায় জেলে থাকা চরমপন্থি নেতাদের অনুসারীদের নাম এসেছে। আলামিন হাওলাদার খুনেও একই গ্রুপ জড়িত। তবে তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।
কেএমপির মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার খন্দকার হোসেন আহম্মদ জানান, পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তাদের গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্কিত খুলনা নগরীর মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কড়া সমালোচনা করছেন প্রায় প্রতিনিয়ত। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘অভ্যুত্থানের এক বছরেও পুলিশ বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ সুযোগে পলাতক সন্ত্রাসীরা এলাকায় ফিরে এবং কেউ কেউ জেল থেকে বেরিয়ে অপকর্ম করছে। পুলিশ সক্রিয় না হলে এদের প্রতিরোধ করা কঠিন।’ তিনি বলেন খুলনার পুলিশ প্রশাসনের নগরীতে এখন তেমন কোন টহল ডিউটি চোখে পড়েনা। এক কথায় খুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এখন সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘নিরস্ত্র জনগণের আস্থা পুলিশের ওপর। এ জন্য চৌকস ও দক্ষ কর্মকর্তাদের থানা পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া জরুরি। তাহলে বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরবে।
যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লা হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বৃহস্পতিবার মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, খুলনা আজ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নগরীতে পরিণত হয়েছে। শুধু মাহবুব হত্যা নয়, এই হত্যার পরেও নগরীতে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু কোনটির কিনারা হয়নি। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যার কোনো বিচার হচ্ছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ কঠোর কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকে সাহসী যোদ্ধার মতো লড়াই করেছেন মাহবুব। তিনি ছিলেন বিএনপির পতাকাতলে এক অকুতোভয় সৈনিক। সেই মাহবুবকে কিছুদিন আগে তার নিজ বাড়ির সামনে নির্মমভাবে গুলি ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর ছোট ছোট বাচ্চার মুখের দিকে তাকানো যায়না। পিতাহারা শিশু ও তাঁর বিধবা স্ত্রী, স্বজনরা মাহবুব হত্যার বিচার চান।