Home Lead ঝিনাইদহে গুলিতে নিহত ৩, দায় স্বীকার চরমপন্থী সংগঠনের: প্রতিশোধ ও আধিপত্য বিস্তার...

ঝিনাইদহে গুলিতে নিহত ৩, দায় স্বীকার চরমপন্থী সংগঠনের: প্রতিশোধ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চরমপন্থিদের দ্বন্দ্বে তিন হত্যা

14


খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক নেতা হানেফ আলীসহ তিনজনকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতরা সবাই একসময় চরমপন্থী দলের নেতাকর্মী ছিলেন। হত্যার নেপথ্যে রয়েছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কায়েতপাড়ার বাঁওড় দখল। এদিকে আরেক চরমপন্থী দল জাসদ গণবাহিনী বার্তা পাঠিয়ে এই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। এতে জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। দুই দশক আগে একই এলাকায় পাঁচজন খুনের পর আবার খুনের ঘটনায় চরমপন্থি অধ্যুষিত ঝিনাইদহ আবারও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে এমন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিহত তিনজন হলেন- ঝিনাইদহের হরিণাকু-ু উপজেলার আহাদনগর গ্রামের রাহাজ উদ্দিনের ছেলে হানেফ আলী (৫৬) ও তাঁর শ্যালক উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের লিটন (৩৫) এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলার রাইসুল ইসলাম (২৮)। হানেফ পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক নেতা ও আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের নেতা ছিলেন। তিনি একটি মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি ছিলেন, পরে তিনি সাধারণ ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পান। তবে কারাগার থেকে বের হয়েও তিনি চরমপন্থি দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
শুক্রবার রাতে শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর শ্মশানঘাট এলাকায় প্রতিপক্ষের লোকজন তিনজনকে হত্যা করে। রাতেই ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, কায়েতপাড়া বাঁওড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুইদল চরমপন্থি শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রামচন্দ্রপুর শ্মশানঘাট এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের মধ্যে ৮/১০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। এসময় গুলির শব্দে ভয়ে আশপাশের গ্রামের কেউ ঘর থেকে বের হননি। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন চরমপন্থির কোপানো ও গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখতে পায়। এসময় সেখানে তাদের ব্যবহৃত দুটি পালসার মোটরসাইকেল ও পিস্তলের একটি ম্যাগাজিনসহ বেশকিছু গুলির খোসা উদ্ধার করে। সবাইকে মাথায় গুলি করে ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (জনযুদ্ধ) ও জাসদ গণবাহিনীর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। হত্যার বিষয়ে চরমপন্থী সংগঠন জাসদ গণবাহিনীর শীর্ষ নেতা কালু দায় স্বীকার করে গণমাধ্যমকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনাবাসীর উদ্দেশে জানানো যাচ্ছে, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি নামধারী কুখ্যাত ডাকাত বাহিনীর শীর্ষ নেতা অসংখ্য খুন, গুম, দখলদারী, ডাকাতি, ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হরিণাকু-ুনিবাসী হানিফ তার দুই সহযোগীসহ জাসদ গণবাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। এই অঞ্চলের হানিফের সহযোগীদের শুধরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো, অন্যথায় আপনাদের একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।’
কালুর (৭০) বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুর গ্রামে। ২০০৩ সালের ৫ ডিসেম্বর একই স্থানে পাঁচজনকে গলাকেটে ও গুলি করে হত্যা করে চরমপন্থিরা। সেই মামলায় গত বছরের ২৯ অক্টোবর কালুসহ দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ দেন আদালত। আলী রেজা কালু ৫ আগস্টের পরে ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে আদালত রায় ঘোষণার সময় উল্লেখ করা হয়।
পলাতক কালু কুষ্টিয়ার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলী মোর্তজা খসরুর বড় ভাই ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাতের চাচা।
হানেফ পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক কমান্ডার। ৯০এর দশকে হত্যা ও ডাকাতির মাধ্যমে এলাকায় অপরাধজগতে একক আধিপত্য বিস্তার করে। হানেফের বিরুদ্ধে ১৩টি হত্যাসহ অপহরণ ও ডাকাতির বহু মামলা আছে। হরিণাকু-ুর আলফাজ হত্যা মামলায় তার ফাঁসির আদেশ হয়। উচ্চ আদালতেও ফাঁসির রায় বহাল থাকলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের বিশেষ ক্ষমায় প্রাণ ভিক্ষা পেয়ে এলাকায় ফিরে আবারও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল হানেফ। এরপর মৎস্যজীবী লীগের হরিণাকু-ু উপজেলা কমিটির সহ সভাপতি হন। হানেফের এক ভাই হরিণাকুন্ডুু উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আরেক ভাই উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান সহ-সভাপতি।
গত ৭-৮ বছর ধরে হরিণাকু-ুর নারায়নকান্দি কায়েতপাড়া বাঁওড় দখল করে মৎস্য চাষ করে আসছিল। ২০১৪ সালে জেল থেকে বের হয় হানেফ। পরে ২০১৭ সালে ওই বাঁওড়ের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জিয়াউর রহমানকে জবাই করে হত্যা করে বাঁওড়ের দখল নেয় হানেফ। সম্প্রতি বাঁওড় দখলকে কেন্দ্র করে এলাকার কয়েকটি নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠনের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। বাওড়টিতে বছরে কোটি টাকার ওপরে মাছের চাষ হয়।
গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর হানেফ আবারও রাজনৈতিক রঙ পাল্টে পুনরায় এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এলাকাবাসীর জানান, হানেফ ইতোপূর্বে কুলবাড়িয়া গ্রামের আলফাজ, তিওরবিলা গ্রামের লুৎফর রহমান, তাহেরহুদার আব্দুল কাদের ও পোলতাডাঙ্গার ইজাল মাস্টারসহ অন্তত ১২ জনকে গুলি করে ও গলাকেটে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে ইজাল মাস্টারকে হত্যার পর তার মাথা কেটে ফুটবল খেলেছিল হানেফ।
হানেফের ভাই সাজেদুল ইসলাম জানান, আমরা এখনো মামলা করিনি। পারিবারিকভাবে রোববার সকলে বসব। আলাপ আলোচনা করে মামলা করা হবে। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে আমি তাদের বিচার চাই।
নিহত রাইসুলের বাড়ি হত্যাকা-ের ঘটনাস্থলের দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পিয়ারপুর গ্রামে। রাইসুলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। রাইসুলের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, রাইসুল কোনো সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। রাইসুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা-নানিসহ স্বজনেরা আহাজারি করছেন। প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
রাইসুলের মা রেহেনা পারভিন জানান, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত রাইসুল বাড়িতেই ছিলেন। বিকেল পাঁচটার কিছু সময় পর তার মুঠোফোনে কল আসে। রাইসুল ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির উদ্দেশে বলেন, ‘বড় ভাই আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।’ এই বলে মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে যান তিনি। এরপর রাত নয়টার দিকে কল দিলে নম্বর বন্ধ পান। রাত সাড়ে তিনটার দিকে জানতে পারেন, বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে রামচন্দ্রপুর এলাকার মাঠের মধ্যে তার ছেলের লাশ পড়ে আছে।
তিনি বলেন, গ্রামের স্কুলে পড়ালেখা করিয়ে ছেলেকে ঝিনাইদহ কে সি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পড়ান। এরপর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক পাস করান। বাড়িতেই থাকতেন ছেলে। কোনো চাকরি বা ব্যবসা করতেন না। সম্প্রতি দৌলতপুর থেকে তার বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে ৯ লাখ টাকা পান। সেই টাকার মধ্যে ৭ লাখ টাকা স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে দেন। সেই টাকা ফেরত নিয়ে কিছু ঝামেলা চলছিল।
শৈলকুপা থানার ওসি মাসুম খান জানান, বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য নিয়ে এ হত্যার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। তবে শৈলকুপা থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান জাকারিয়া বলেন, হানেফ নিষিদ্ধ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক কমান্ডার ছিলেন। তিন হত্যার প্রকৃত কারণ বের করতে পুলিশ কাজ করছে। হানিফকে হত্যার দায় স্বীকার করা জাসদ গণবাহিনীর কালু পরিচয়দানকারীদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল এটা প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। আমরা এটা নিয়েও তদন্ত করছি।