Home আঞ্চলিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার খোকন রাজাকারের দুই ভাগ্নেকে নিয়ে তোলপাড়

অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার খোকন রাজাকারের দুই ভাগ্নেকে নিয়ে তোলপাড়

14

ফরিদপুর প্রতিনিধি:

হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছেন ফরিদপুরের সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। একসময় যাদের ব্যাংক হিসেবে লাখ টাকাও ছিল না, তারা এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। ফরিদপুর শহর, শহরতলিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিনেছেন কয়েক শ একর ভূসম্পত্তি। ঢাকা-ফরিদপুর রুটে নামিয়েছেন শতাধিক বেশি বিলাসবহুল গাড়ি। ঢাকার অভিজাত এলাকায় বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন একেবারেই কপর্দকহীন পরিবারের সন্তান আলোচিত এ দুই ভাই। রাতারাতি তাদের সম্পদের এ উল্লম্ফনে বিস্ময় ছড়িয়েছে ফরিদপুরের সকল শ্রেণির মানুষের চোখে।

অবশেষে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলা ও ভাংচুরের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। রোববার রাতে আগ্নেয়াস্ত্র, মাদক ও নগদ টাকা, সরকারি চালসহ তাদের গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ। পরে সোমবার দুপুরে ফরিদপুর জেলার পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান একই প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

আটক বরকত ও রুবেল সম্পর্কে আপন দুই ভাই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খোকন রাজাকারের আপন ভাগ্নে এ দুই ভাই। তাদের গ্রেপ্তারের খবরে জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাজ্জাদ হোসেন বরকত ফরিদপুর জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি। বরকত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আর তার ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেল ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক ভোরের প্রত্যাশা নামক পত্রিকার সম্পাদক। অর্থ আর সম্পদের লোভে এক সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়ান এ দুই ভাই। পরে ক্ষমতা বদলের পর তারাও রূপ বদলান। রাজনীতিকে ব্যবহার করে ত্রাস হয়ে ওঠেন ফরিদপুরের। তাদের দাপটে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এখন কোনঠাসা। কেউ কেউ অপমানে, অভিমানে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন।

বরকত ও রুবেলের বাবা আবদুস সালাম মন্ডল ছিলেন বিএডিসির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। অভাবের সংসারের কারণে পড়ালেখা বেশিদূর করতে পারেননি তারা। এরশাদের জমানায় ফরিদপুর শহরের রাজবাড়ী মোড়ে পরিবহনে চাঁদা উঠাতেন দুই ভাই। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে পরিচয় হয় স্থানীয় বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে। এরপর থেকে ওই নেতার ঘনিষ্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই সময় কোমরপুর এলাকার জাকির নামের এক যুবকের দুই হাত কেটে প্রথম আলোচনায় আসেন দুই ভাই। পরে ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এডভোকেট মহিউদ্দিন খোকনকে হত্যার অভিযোগ উঠে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। মামলা হয় তাদের বিরুদ্ধে। আসামি করা হয় ১ ও ৩ নম্বর। এরপর গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দেন তারা। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিহত খোকনের বাড়িতে যান সমবেদনা জানাতে। অভিযোগ রয়েছে অদৃশ্য ইশারায় পার পেয়ে যান এই দুই ভাই। হত্যা মামলার রায়েও খালাস পান তারা। ফের প্রকাশ্যে এসে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ক্ষমতার পালা বদলে তারা ভিড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। সান্নিধ্যে আসেন ফরিদপুর আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার। এরপরই ভাগ্য খুলে যায় দুই ভাইয়ের। জড়িয়ে পড়েন টেন্ডারবাজিতে।

স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৯ বছরে ফরিদপুর শহরে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল-দারিত্ব ও মাদকবাণিজ্যের জাল ছড়িয়েছে দুই ভাই বরকত ও রুবেল। এসব অপকর্ম করে দেশে-বিদেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন তারা। তাদের জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে প্রায় ৬৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। পরে এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি।

ফরিদপুর পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, গত ১৬ মে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মারধরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের বদরপুর মোড় হতে প্রথমে বরকত, রুবেল ও বিপুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের জব্দকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি পিস্তল ও ৯১ রাউন্ড গুলি, দুইটি শর্টগান ও ১৮০টি কার্তুজ, ব্রান্ডের ছয় বোতল বিদেশি মদ, ৬৫ পিস ইয়াবা, খাদ্য অধিদপ্তরের এক হাজার ২০০ বস্তায় ৬০ হাজার কেজি চাল, তিন হাজার ইউএস ডলার, ৯৮ হাজার ভারতীয় রুপি ও বাংলাদেশি ২৯ লাখ টাকা। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন- সহযোগী রেজাউল করিম বিপুল, আওয়ামী লীগ নেত্রী ইয়াসমিন সুলতানা বন্যা মন্ডল, ছাত্রলীগ নেতা এনামুল ইসলাম জনি, অমিয় সরকার, বর্ধিত ১৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চক্রবর্তী, সাবেক ৬নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর মাহফুজুর রহমান মামুন ও জাহিদ খান।

পুলিশ সুপার জানান, বরকত ও রুবেলের কোমর হতে গুলিভর্তি ম্যাগজিনসহ সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ বোরের পিস্তল জব্দ করা হয়। এছাড়া বরকতের রেস্ট হাউস হতে বিদেশি মদ ও খাদ্য অধিদপ্তরের এক হাজার ২০০ বস্তাভর্তি চাল এবং রুবেলের ড্রয়ার হতে ৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।

আলিমুজ্জামান জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও সরকারি চাল গুদামজাত করার অপরাধে নিয়মিত মামলা হবে। তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ আরও বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলকে গ্রেপ্তারের খবরে তাদের বিচার ও শাস্তি দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের একাংশ।

ফরিদপুরে প্রেসক্লাবের সামনে সোমবার বেলা ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত এ বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ বোস। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মনিরুল হাসান মিঠু, কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খলিফা কামাল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সামচুল আলম চৌধুরীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

৬৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সরেজমিন অনুসন্ধানে ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে দুই ভাইয়ের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফরিদপুর স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশলী অধিদপ্তরে নির্বাহী কার্যালয়ের ২০১০-১১ থেকে ২০১৭-১৮ সাল পর্যন্ত চুক্তিকৃত কাজের সংখ্যা ১৯৬টি। তার মধ্যে এস.বি ট্রেডার্স শূন্য ও মেসার্স রাফিয়া কনষ্ট্রাকশন ১ (০.৫১%) কাজ করেছে। দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক আলোচিত এই দুই ভাই। এই দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অঢেল সম্পদ অর্জন করেছেন। জানা যায়, সাজ্জাদ হোসেন বরকত ২০১২-১৩ করবর্ষে প্রথম আয়কর নথি খুলেন। আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী

২০১২-১৩ সাল থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন। দুদক তাদের অনুসন্ধানে সাজ্জাদ হোসেন বরকতের রেকর্ডপত্র, আয়কর নথি ও আনুসাঙ্গিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখেছে, ২০১২-২০১৩ থেকে ২০১৯-২০২০ সাল পর্যন্ত নিজ নামে, তার স্ত্রী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৬২ কোটি ১৮ লাখ নয় হাজার ৪৪৩ টাকা মুল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেন। যার মধ্যে বরকতের নিজের, স্ত্রীর এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ২৯ কোটি ৯৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৩ টাকা আয়ের উৎস পাওয়া গেছে।

যার মধ্যে ৩২ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৮০ টাকা আয় বর্হিভুত উপার্জন করেছেন। এর বাইরেও বরকত, তার স্ত্রী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে আর কোন সম্পদ আছে কিনা জানতে নোটিশ জারি করা হয়েছে।

এদিকে দুদক বরকতের ছোট ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের বিষয়ে তদন্তে জানতে পেরেছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ করবর্ষে প্রথম তিনি আয়কর নথি খুলেছেন এবং প্রতিবছর তিনি আয়কর দাখিল করছেন। অনুসন্ধানে রুবেলের রেকর্ডপত্র, আয়কর নথি ও আনুসাঙ্গিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে নিজের, স্ত্রী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৪৮কোটি ৩৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকা মুল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। যার মধ্যে রুবেলের নিজের, স্ত্রীর এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪ কোটি ৭৮ লাখ ৮০ হাজার ৭৬৭ টাকা আয়ের উৎস পাওয়া গেছে। বাকি ৩৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ২৩৩ টাকা আয়ের সঙ্গে অসামজ্ঞস্যপূর্ণ পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের বাইরেও তাদের নামে আর কোন সম্পদ আছে কিনা তা তদন্ত করছে দুদক।

মাদক বিক্রিসহ পরিবহন খাত থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে বরকত-রুবেলের বিরুদ্ধে। দুদকে জমা পড়া নথির সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী, জনতা ব্যাংকের মোড়, মুন্সীর বাজার বাইপাস, মচ্চর ইউনিয়ন, গোয়ালচামট, রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকায় কয়েক শ একর জমি কিনেছেন দুই ভাই। ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেল চরের জমি দখল করে নারকেলবাগান, কলাবাগান, গবাদিপশুর খামার তৈরি করেছেন তারা। এ ছাড়া নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বরকত ও রুবেল।

অভিযোগ আছে, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ফরিদপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান চৌধুরীকে রীতিমতো জিম্মি করে শহরের শত কোটি টাকা মূল্যের জমি লিখে নিয়েছেন বরকত ও রুবেল। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খোকন রাজাকারের আপন ভাগ্নে এ দুই ভাই। তারাই খোকন রাজাকারকে সুইডেনে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন বলে তথ্য আছে। খোকনের ছেলেও সুইডেনে থাকেন। বরকত ও রুবেলের সঙ্গে তাদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। সুইডেনে অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে।