Home Lead বন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে ঝুঁকিতে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন

বন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে ঝুঁকিতে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন

16
সুন্দরবনের দুবলার চরে মেলা

স্টাফ রিপোর্টার।।


সুন্দরবনের গহীনে প্রতিবছর রাস উৎসবের মৌসুমে এক শ্রেণির মানুষ বন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে দুবলার চরের মতো এলাকাগুলোতে, যেখানে একদিকে উৎসবের তাণ্ডব, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে পরিবেশ দূষণ এবং বন্যপ্রাণীর শিকারের ঘটনা। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে সুন্দরবন, যা ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য, বর্তমানে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

রাস উৎসব উপলক্ষ্যে গত ৩ থেকে ৫ নভেম্বর দুবলার চরসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বসেছিল ব্যাপক মেলা। এখানকার দোকানে পসরা সাজানো, আলোকসজ্জা, উচ্চ শব্দে বাজানো মাইক এবং বিভিন্ন ধরনের খাবারের প্রচুর আয়োজন ছিল। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মেলার প্রায় প্রতিটি অংশে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার। এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন সহজেই বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে বন ও সমুদ্রের পরিবেশে। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, প্লাস্টিকের পরিমাণ এত বেশি যে, তা বিশাল পরিসরে পরিবেশে দূষণ সৃষ্টি করছে এবং বন্যপ্রাণিদের জন্যও মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

রাস উৎসবের মেলা শুধু পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারকারীদের জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উৎসবের তিন দিনে দুবলার চরের আশেপাশে শিকারের জন্য ফাঁদ পাতা হয়। এ সময় বনের ভিতরে হরিণ শিকারের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করা কিছু লোক আটকও হয়। বন বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে এই ধরনের কর্মকাণ্ড রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

সুন্দরবন বাঁচাতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সংস্কৃতি বা সামান্য কিছু রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি বন রক্ষা করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন এই ধরনের বন বিধ্বংসী কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, ততদিন সুন্দরবনও ক্ষতির মুখে পড়বে। একসময় আমরা যেমন সিলেটের সাদা পাথর হারিয়েছি, তেমনি সুন্দরবনও হারাতে হতে পারে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘সুন্দরবন এমনিতেই সংকটে রয়েছে। রাস মেলাতে সনাতন ধর্মালম্বীদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মের অনেক মানুষও আসেন। এতে বনের উপর চাপ বেড়ে যায় এবং বন্যপ্রাণীর শিকারও বাড়ে। তাই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুবই জরুরি।’

এ বিষয়ে পরিবেশ সচেতনদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। তারা অভিযোগ করছেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত থাকলেও, বন বিধ্বংসী কার্যক্রম থামানো যাচ্ছে না। বিশেষত, রাস উৎসবের সময় এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক বলেন, ‘সুন্দরবনের মাঝে এই ধরনের মেলা ও শুটকি কেন্দ্রের খোলামেলা বেচাকেনা দেখে আমি হতাশ। পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার এখানে বেড়ে গেছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ বিষয়ে একযোগভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।’

বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাস উৎসব চলাকালীন সময়ে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে দুবলার চরের সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে ৩২ জন ব্যক্তি আটক করা হয় এবং ৭ হাজার ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। যদিও বন বিভাগের এমন পদক্ষেপ প্রশংসনীয়, তবুও এ ধরনের কার্যক্রমে কঠোর শাস্তির বিধান এবং আগাম সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ।

এ বছর রাস উৎসবে সুন্দরবনে পরিবেশের অবনতির মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এভাবে বন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে, তাহলে সুন্দরবন তার বণ্যপ্রাণী, বনজসম্পদ, এবং জীববৈচিত্র্য হারাতে পারে। সুতরাং, সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ এবং পরিবেশবাদীদের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। বন বিভাগের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে, সুন্দরবনকে বাঁচানো সম্ভব।