Home আঞ্চলিক খুলনায় ইটের ভাটায় পুড়ছে শৈশব

খুলনায় ইটের ভাটায় পুড়ছে শৈশব

9

স্টাফ রিপোর্টার।।

৯ বছর বয়সী সিয়ামের দিন কাটে ইটের ভাটায়। প্রতিদিন সকালে ইটের সারি ঢেকে রাখা পলিথিনগুলো সরাতে হয় তাকে। দুপুরে ওই ইট উল্টে দিতে হয়। বিকেলে আবারও সেই ইটের সারি পলিথিনে ঢেকে দেয়। এতে তার দৈনিক আয় হয় ৮০ টাকা। মা জেসমিনের সঙ্গে সিয়াম কাজ করে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া গ্রামের সেতু ব্রিকস নামের একটি ভাটাতে। বাবা না থাকায় মায়ের সঙ্গে তাকেও কাজ করতে হয়। সিয়াম জানায়, বছরের ছয় মাস তার মা এখানে কাজ করেন। তার সঙ্গে কাজ করে সিয়ামও। কাজ তেমন কষ্টের না হলেও দ্রুত কাজ করার তাড়া থাকে, বকা শুনতে হয়। মা ভাটায় কাজ করায় তার স্কুলেও যাওয়া হয় না, সেখানেই কাজ করতে হয়। সিয়ামের মতো আরেক শিশু তাফসির ইট পরিবহনে সহায়তা করে। ভ্যানে ইট তোলা, ভ্যান ঠেলা ও ইট নামানোর কাজ তার। প্রতিদিন বিকেলে শুকানো ইট ভ্যানে তুলে দেয় সে। পরে প্রাপ্তবয়স্কদের সহায়তা করে ইটের ভ্যান চালানোর কাজে। গন্তব্যে পৌঁছালে ভ্যান থেকে ইট নামিয়ে দেয়। এতে তার দৈনিক আয় হয় ৯০ টাকা।

শুধু শিশু সিয়াম বা তাফসির নয়, খুলনার প্রায় প্রতিটি ইটের ভাটায় এমন শিশুশ্রমিকের সংখ্যা অগণিত। তাদের অভিভাবকরাও ওই ভাটাতে কাজ করেন। যেসব ভাটার শ্রমিকদের পরিবারে ছোট সন্তান থাকে, দালালরা তাদের ভাটাতে কাজ করাতে উৎসাহ দেয়। কারণ শিশুদের কম টাকায় বেশি কাজ করানো যায়। ভাটার একাধিক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাটার মালিকদের সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো চুক্তি থাকে না। মূলত দালালরা মালিকদের সঙ্গে চুক্তিতে ইট তৈরির যাবতীয় কাজ করেন। মাটি কাটা, ইট তৈরি, পরিবহন ও পোড়ানোর জন্য আলাদা আলাদা শ্রমিকের দরকার পড়ে। লোকালয় থেকে বিভিন্ন চুক্তিতে তারা এসব কাজের শ্রমিক জোগাড় করে দেন। এর মধ্যে ইট শুকানো ও পরিবহনের কাজে সহায়তার জন্য দালালরা শিশুদের বেশি পছন্দ করেন। লুৎফুর নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘সাধারণত ইট গুনে তারা দালালদের কাছ থেকে টাকা নেন। তবে শিশুরা টাকা নেয় দিনভিত্তিক। তাই ছোট ছোট কাজ শিশুদের দিয়ে করালে কম টাকায় করানো সম্ভব হয়। এ জন্য দালালরা শিশুশ্রমিকদের ভাটার কাজে উৎসাহিত করেন। এক শিশুশ্রমিকের বাবা জানান, ‘তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চারজনের সংসার। মৌসুমের শুরুতে তিনি ও তার স্ত্রী ইট তৈরির চুক্তিতে ভাটাতে এসেছেন। এখানে আসার পর তার ৯ বছরের ছেলে ও ১১ বছরের মেয়েও ভাটাতে কাজ করছে।

এতে ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমে দৈনিক আয় হচ্ছে ১৬০ টাকা। অন্যদিকে তার ও স্ত্রীর দৈনিক প্রায় ৮০০ টাকা আয় হয়। ওই শিশু শ্রমিকের বাবা বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের ভাটার কাজে লাগাতে চাইনি। তবে সারা দিন এখানে খেলাধুলা করে বেড়ায়। তাই ওদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। এতে দালালও খুশি, আমাদের উপার্জন বেড়েছে।’ বাংলাদেশ শ্রম আইনে ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে কাজে নিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ২০১১ সালে ইউনিসেফ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ বছরের নিছে বাংলাদেশের প্রায় ৪৭ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ শিশুকে জোর করে কাজে নিযুক্ত করা হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খুলনা বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুশ্রম নিয়ে খুলনায় কয়েকটি প্রকল্প চলছে। এর মাধ্যমে অনেক শ্রমিক শিশুকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে ইটের ভাটার শিশুশ্রম বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর দেখাশোনা করে। এটি আমাদের অধীন নয়।’

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক ডা. নবীন কুমার হাওলাদার বলেন, ‘শিশুশ্রম প্রতিরোধে আমাদের একটি সমন্বিত কমিটি আছে। অনেক শিশুকে আমরা শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। তবে ইটের ভাটাতে যে শিশুশ্রমিক আছে, এটি আমাদের জানা ছিল না। এ বিষয়ে খোঁজ নেব।’

খুলনা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। তিনি বলেন, ‘ভাটাতে শ্রমিক আমরা নিয়োগ দিই না। দলালের মাধ্যমে শ্রমিকরা এসে কাজ করেন। আমরা সব সময় শিশুদের কাজ করাতে নিরুৎসাহিত করি।’