শিক্ষা এবং শিক্ষকদেরকেই কেনো বারবার রাস্তায় নামতে হবে?

106
Spread the love

মোঃ আশফিকুর রহমান।।

মোটাদাগে বাংলাদেশের ভালোমন্দ যদি বলি তাহলে খুব সংক্ষিপ্তকারে পরিষ্কার ভাষায় এক নিশ্বাসে বলা যায়, চরম অসহনীয় মূল্যস্ফীতি, রির্জাভের সংকট, ব্যাংকিং ব্যবস্থার নৈরাজ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সেক্টরের ক্রমাগত বিপর্যয়, সরকারি চাকুরীজীবীদের মধ্যে দুর্নীতির ব্যাপকতা, রোহিঙ্গা সংকট, খাদ্যউৎপাদনের অপ্রতুলতা, গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংকট, ভূরাজনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, প্রকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি।

কিন্তু এগুলোর মধ্যেও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যেতে চাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অবনতি এবং শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অবহেলা। কিছুদিন আগেই একটা প্রত্রিকা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন করলো যেখানে আমাদের সোনার বাংলার শিক্ষকদের বেতন গড়ে সবথেকে কম। মাত্র ১৭০ ডলার! ভাবা যায়, এ দুর্মূল্যের বাজারে কিভাবে একজন প্রাইমারি শিক্ষক তার পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করছে। এই বেতন একজন বড় সরকারি কর্মচারীর ড্রাইভারের বেতনের থেকেও কম! তাহলে একটা দেশের শিক্ষকদের কি পরিমাণ সম্মানিত আমরা করছি! যাদেরকে আপনি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারীগর বলছেন তাদের ঘরেরই তো কোন ছাদ নেই! আর বিভিন্নসময় শিক্ষার পরিবর্তন, এই শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের কে একধরনের গিনীপিগে রুপান্তর করেছে বলেই মনে হয়। এছাড়াও শিক্ষকদের বিভিন্ন সময়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও দেখেছি কিভাবে তাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করে হয়েছে।

এবার আসি উচ্চ শিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। যেহেতু আমি এই শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন মানুষ কিছু বলতে চাই। আমরা জানি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এবং সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারা বা হতে চাওয়া একটা স্বপ্নের মত। কারণ প্রতি বছর বহু ছাত্রছাত্রী এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে কিন্তু কতজন তার নিজের বিভাগে চাকুরির জন্য আবেদন করতে পারার সক্ষমতা অর্জন করে, সেটা একটা চিন্তার বিষয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র তারাই নিয়োগ পান বা আবেদনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হোন, যাদের উচ্চ সিজিপিএ ৩.৫০ এর উপরে এমনকি প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় এবং গবেষণায় ভালো, প্রকাশনা আছে (যদিও এন্ট্রি লেভেলে অনেকসময় প্রকাশনা চাওয়া হয় না) এবং স্কুল- কলেজ লেভেলে ৪.৫০ জিপিএ আছে। কিন্তু অনান্য চাকুরী বা বিএসএস যার কথায় বলি না কেনো এন্ট্রি লেভেলে রেজাল্টের এই বার কিন্তু নেই। তাহলে আপনি যেখানে সব থেকে মেধাবীদেরকে চাকুরী দিচ্ছেন বা দিতে চাইছেন তাদেরকে কেনো সব থেকে কম সুযোগ সুবিধা দিবেন?

অনেকেই বলতে পারেন মুখস্থ করে ক্লাসে ফাস্ট সেকেন্ড থার্ড হয়েছে। বিসিএসও শতভাগ মুখস্থ নির্ভর, এর ভাইভার গাইড বইও বাজারে পাওয়া যায়। আপনারা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তারা জানেন বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে কত ধরনের এসেসমেন্টের মধ্যদিয়ে যেতে হয়। যেমন- ভাইভা, প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট, রিপোর্ট, ল্যাবটেস্ট, কুইজ প্রতিযোগিতা, ক্লাস টেস্ট, থিসিস এবং সর্বশেষ টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার মাধ্যমে তার সিজিপিএ নির্ধারিত হয়। তাহলে এতগুলো ধাপ যারা পার করে ক্লাসের টপার হলো তাদের কে আপনি কেনো মূল্যায়নে বৈষম্য করবেন। সুযোগ সুবিধা কম দিবেন, যা আছে তাও কেটে নিবেন,এটা মোটেই কাম্য বা প্রসংশনীয় নয়। সবকিছু কেনো একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য আপনি রাখবেন, বাকিরা কিছুই পাবে না তা তো হতে পারে না। আমি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ করবো সাময়িক এই আন্দোলনে তাদের কিছুটা ক্ষতি হয়তো হচ্ছে, কিন্তু ভেবে দেখুন এই আন্দোলন কিন্তু আমরা আপনাদের জন্যই করছি, যেন ভবিষ্যতে আপনারা এই পেশা থেকে বিমুখ না হয়ে যান। কারণ আমরা যারা আন্দোলন করছি তারা সবাই বিদ্যমান ব্যবস্থায় থাকবো, কিন্তু আমরা আপনাদের কথা চিন্তা করেই এই আন্দোলন করছি।

বর্তমান সময়ে মেধা পাচার বা ব্রেইন-ড্রেইন বাংলাদেশের জন্য একটা চরম প্রকাশিত সত্য এবং দুর্ভাগ্যেও বটে। কিন্তু এই জাতীয় সমস্যাকে কেনো নীতিনির্ধারণী মহল থেকে কমানোর, বা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে না বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়। যেখানে মেগাপ্রজেক্টের মাধ্যমে অনান্য দেশ যেমন চায়না বা ভারত তাদের চলে যাওয়া মেধাবীদের কে দেশে ফিরিয়ে আনছে, সেখানে আমরা অনেকটা উল্টো পথে হাটছি, কিভাবে মেধাবীদের বা ক্লাসের টপারদের কে বাইরে চলে যেতে উৎসাহ দেওয়া যায় সেটাই করছি। কিছুদিন আগে বুয়েটের একটা খবর দেখে আতকে উঠলাম যে তাদের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দেশের বাইরে চলে গেছে এবং যাচ্ছে। কি সাংঘাতিক! কিন্তু তাদের থাকার জন্যই বা আমরা কি করেছি, সরকারি মহল থেকে নিতীনির্ধারক পর্যন্ত কোন মহলে কোন হেলদোল নেই। বিসিএস কেন্দ্রিক একমূখী এক চাকরির ব্যবস্থা করে সর্বময় ক্ষমতা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা তাদেরকে দিয়ে রেখেছি, তাহলে মেধাবীরা কেনো থাকবে এই দেশে?

বর্তমান সময়ে “প্রত্যয়” নামক চরম অপমানজনক এবং বৈষম্যমূলক যে ব্যবস্থা শিক্ষকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হলো, তাতে এই পেশা থেকে পরবর্তীতে মেধাবী টপাররা মুখ ফিরিয়ে নিবে এটাই স্বাভাবিক। চাকরির বাজার যত বেশি ডাইভার্সিফাইড হবে ততোবেশি দেশ উপকৃত হবে, দেশে বেকার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে, সেখানে চাকরি বলতে আমরা শুধু বিসিএস কে প্রাধান্য দিচ্ছি। দেশপ্রেমের জন্য অন্তত কেউ বিসিএস ক্যাডার হয় না, তার প্রমাণ এখন প্রকাশিত। সরকারি চাকুরীজীবীদের দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার এখন সুরে‌্যর আলোর মত পরিষ্কার। তবে হ্যাঁ আমি আমার পূর্বের একটা লেখাতে বলেছিলাম, সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার আমি বিপক্ষে নয়। একটা দেশ চালানোর জন্য মাঠপর্যায়ে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে রাষ্ট্রের নানবিধ কার্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের। এইকারণেই তাদের দৌরাত্ম্য বা আধিপত্য আজ রাষ্ট্রের সর্ব জায়গায় বিদ্যমান। সবাই প্রশাসক! কেউ সেবক নই!

শিক্ষার এই দুরবস্থার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে নিতীনির্ধারনী মহল সবাই একরকম চুপ। শিক্ষা এবং শিক্ষকদের জীবনমান বা সুযোগ- সুবিধা বৃদ্ধির কথা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চস্থান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী থেকেও আসে না, তার বিপরীতে নানাবিধ খড়্গ যেমন-“প্রত্যয়” এর মত চরম বৈষম্যমূলক ও অপমানজক ব্যবস্থা নাজিল হয়। উল্লেখ্য ২০২৩ সালে জারিকৃত সর্বজনীন পেনশন আইন এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যে চারটি পেনশন স্কীমের বর্ণনা দেওয়া হয়েছিলো সেখানেও “প্রত্যয়” এর উল্লেখ ছিলো না। সুতরাং কাদের পরামর্শে একেবারে রাতারাতি তড়িঘড়ি করে এহেন বৈষম্যমূলক ব্যস্থার অবতারণা করা হলো বোধগম্য নয়।

আসলে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য শিক্ষা নিয়ে ভাবার বা একটা দার্শনিক উপলব্ধি থাকতে হয়, শিক্ষা সম্পর্কিত মন্ত্রি থেকে প্রতিমন্ত্রী বা সরকারি আমলাদের মধ্যে সেটা চরমভাবে অনুপস্থিত, বলেই মনে হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিযোগী ভাবি। যেটা কখনই কাম্য হতে পারে না। তাদের বরং দেশের কল্যাণের জন্য কেনো শিক্ষা এবং শিক্ষকদেরকে যথাযথ সুযোগ সুবিধা দিতে হবে তার সহায়ক হিসেবে কাজ করা উচিৎ, না হলে একটা দেশের শিক্ষকদের সাথে এমন অবহেলা বা বৈষম্য করা হয়! আর উচ্চ শিক্ষার জন্য ইউজিসি আছে তাদের কখনো দেখলাম না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের সাথে কাজ করতে। তারা শুধু কিছু প্রজেক্ট করবে, এবং আইকিউএসির মাধ্যমে শিক্ষকদের ট্রেনিং দিবে আর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিবে। কিন্তু শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন, সুযোগ-সুবিধা বা গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডের ব্যবস্থা করবে এগুলো তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। তারাও সরকারি আমলাদের মত একধরনের শাসকে রুপান্তরিত হয়েছে বলেই প্রতিয়মান হয়।

মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন এই পেশায় আসে এবং শিক্ষকরা যেন ভালো বেতন বা সুযোগ -সুবিধা পাই সেই ব্যবস্থা করুন। আপনি স্মার্ট বাংলাদেশে গড়ার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু স্মার্ট মানুষ তৈরি না করে স্মার্ট বাংলাদেশ যে গড়া কখনোই সম্ভব নয় সেটা কেনো আপনি বুঝচ্ছেন না, তা বোধগম্য নয়। প্রত্যয় এর মত বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি, এবং জোর দাবী জানাচ্ছি এই ব্যবস্থা দ্রুত প্রত্যাহার করুন। শিক্ষকদের জন্য একটা স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোসহ তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করুন, মেধাবীদের কে আকৃষ্ঠ করতে মেগাপ্রজেক্ট গ্রহণ করুন তা না হলে যতই আমরা “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন দেখি না কেনো, সেটা অধরাই থাকবে। লেখক: মোঃ আশফিকুর রহমান/ সহকারী অধ্যাপক/ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিন/ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ