সৈয়দ রানা কবীর
এক সময় শ্রমিকদের আনাগোনায় ব্যস্ত আর কোলাহলপুর্ণ থাকা শিল্পাঞ্চল খ্যাত খালিশপুর ও আটরা এলাকায় এখন শুনশান নিরবতা। নেই কোন প্রাণচঞ্চলতা। শত শত ব্যাবসায়ীরা তাদের ব্যাবসা বন্ধ করে পুঁজি ভেঙে সংসার চালিয়েছে কয়েক বছর। এখন অনেকে তারা রিকশা, অটো ও সিএনজি চালিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি ও কাজ হারিয়ে গ্রামের বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট, দৌলতপুর, ইস্টান, আলিমসহ ৯ টি জুট মিলে গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে সুনসান নীরবতা। সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে বেসরকারি মালিকানায় ইজারার মাধ্যমে খুলনা অঞ্চলের বন্ধ মিলগুলো চালু করতে কয়েক দফায় টেন্ডার আহ্বান করা হলেও দুই একজন আওয়ামীলীগের ছাড়া অন্য কোন বিনিয়োগকারীদের খুব একটা সাড়া মিলে নাই।
প্লাটিনাম জুট মিলের মতো একই অবস্থা স্টার জুট মিল এবং ক্রিসেন্ট জুট মিলেরও। শর্ত শিথিল করে বিভিন্ন মিলে ৭ থেকে ৮ দফা টেন্ডার আহ্বান করা হলেও তা নানা জটিলতার কারনে বাতিল হয়ে যায়। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে চুক্তি সম্পন্ন হলেও এখনও চালু হয়নি খালিশপুর জুট মিল।
আর্থিক ক্ষতির মুখে ২০২০ সালের জুলাইয়ে খুলনা অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে চাকরি হারান স্থায়ী-অস্থায়ী প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক। পরবর্তী সময়ে পাটকলগুলোকে বেসরকারি খাতে ৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
২০২২ ও ২০২৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে চালু হয় খুলনার দৌলতপুর, ইস্টার্ন এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল। এর মধ্যে জেজেআই জুট মিল কিছুটা ভালো চললেও বাকি মিলগুলো উৎপাদন করছে সক্ষমতার এক চতুর্থাংশেরও কম। সব মিলিয়ে চাকরি হয়েছে প্রায় হাজার দুয়েক শ্রমিকের। যা নিয়ে শিল্পানচলে শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের ক্ষোভের শেষ নেই।
শ্রমিক নেতা খলিলুর রহমান জানান, ‘বেসরকারিভাবে পাটকলগুলো চালু হওয়ায় শ্রমিকদের কোনো লাভ হচ্ছে না। ইজারা নেওয়া নতুন মালিকপক্ষ যে চারটি মিল চালু করেছে তাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের। অথচ একেকটি জুট মিলেই সাড়ে তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করত। যেসব শ্রমিকের কাজ হয়েছে, তাদেরও বেতন দেওয়া হচ্ছে খুবই সামান্য। যদি বেসরকারিভাবে চালাতেই হয়, তাহলে শ্রমিকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মিলগুলো চালাতে হবে।’
আরেক শ্রমিক নেতা দীন মোহাম্মদ জানান , মিল যখন বন্ধ করা হয় তখন বলা হয় এটা সাময়িক ভাবে বন্ধ করা হলো।আগামী তিন মাস পর মিল চালু করা হবে। কিন্তু প্রায় ছয় বছরেও খালিশপুর, খানজাহান আলী ও অভয়নগর থানার নয়টি জুট মিল ভগুর অবস্থায় পড়ে আছে।
তিনি আরো বলেন, ‘খুলনা অঞ্চলের পাটকলগুলোর শ্রমিকরা অন্য কোনো কাজ শেখেনি। ফলে তাদের অনেকটা মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে গত ছয় বছর যাবত। অন্তর্র্বতীকালীন সরকার ক্ষমতা নেওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, তারাও কোনো ভূমিকা রাখছে না।’
এদিকে নতুন মালিকপক্ষের মনে করছে, পর্যায়ক্রমে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হবে মিল। এতে লাভের আশাও করছেন তারা।
দৌলতপুর জুট মিল ইজারা নেয়া ফরচুন গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার মো: ইসহাক আলী বলেন, এক বছর আগে যখন মিলটি চালু করা হয় তখন খুবই ভগুর অবস্থায় ছিলো। মাত্র ১০টি তাঁত নিয়ে উৎপাদন শুরু করা হয়েছিল। এখন প্রায় ৩০টি তাঁত চালু আছে। তবে তা খুবই অপ্রতুল বলে জানান। এটিও লাভের মুখ দেখতে পারছেনা।
যদিও বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) বলছে, টেন্ডার আহ্বানসহ পর্যায়ক্রমে বেসরকারিভাবে চালু হবে সবগুলো মিল। কিন্ত সাবেক সরকারের দলীয় নেতাদের কারনে তা সম্ভব হয়নি। এখনো গত প্রায় এগারো মাসে অন্তর্বতী সরকারও চালু করতে পারলো না।
তবে খালিশপুর শিল্পানচলের বন্ধ মিলগুলো নির্বচিত সরকার ছাড়া আর চালু হচ্ছে না বলে স্হানীয় ও সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ দিকে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে জনগন নির্বচিত করলে তিনি তার উদ্যোগে বন্ধ খালিশপুর, মীরেরডাঙ্গা আটরাসহ সকল সরকারি বন্ধ মিলগুলি চালু করার ব্যবস্থা করবেন। তিনি ইতিমধ্যে এই অনচলের সাধারণ শ্রমিক ও স্থানীয় সাথে এ বিষয়ে কয়েক দফায় বৈঠকও করেছেন। সরেজমিনে তিনি মিলগুলি পরিদর্শনও করেছেন। তিনি বলেন, তার দল সরকার গঠন করলে সাধারণ মানুষের জন্য কল্যানকর কাজগুলো আগে করবেন।
বিজেএমসির খুলনার আঞ্চলিক সমন্বয় কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানী জানান, ‘লিজ প্রক্রিয়ায় আমরা চারটি মিল চালু করেছি। এর মধ্যে জেজেআই ভালো উৎপাদন করছে। অন্য তিনটি মিলও চালু আছে। তারা খুব বেশি উৎপাদন না করলেও মিলগুলোকে উৎপাদনমুখী রেখেছে। অন্যান্য মিল চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। কোনোটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে, কোনোটি হস্তান্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা আশা করি, দ্রুত সবগুলো মিল চালু হয়ে যাবে। বেসরকারিভাবে চালু হওয়া মিলগুলো দ্রুত লাভের মুখ দেখবপ বলে তার দাবি। কিন্ত গত ৫ বছরেও তাদের এই সব কথার ঝুলি কোন কাজে আসছেনা বলে শ্রমিক সমাজ ক্ষোভের সাথে জানান।
বেসরকারি উদ্যোগে চালু হওয়া খুলনার চারটি মিলের মধ্যে জেজেআই মিলে প্রতিদিন ৬০ মেট্রিক টন পাট-পণ্য উৎপাদন হয়। বাকি তিনটি মিলে প্রতিদিন মোট উৎপাদন হয় ১০ টনের মতো। কবে নাগাদ সরকারি এই নয়টি জুট মিল পরিপূর্ণ ভাবে চালু হবে তা নিয়ে শ্রমিক সমাজ রয়েছে চরম উদ্বিগ্ন। স্হানীয়রা দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনসহ সকল বন্ধ কলকারখানা চালু করার ব্যবসহা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।











































