Home জাতীয় ৮১ দিন পর বাসায় ফিরলেন খালেদা জিয়া

৮১ দিন পর বাসায় ফিরলেন খালেদা জিয়া

14
মঙ্গলবার রাতে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছেন খালেদা জিয়া। ছবি: বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সৌজন্যে


ঢাকা অফিস।।


বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভাল। তাই তৃতীয় দফায় এভারকেয়ার হাসপাতালে টানা ৮১ দিন চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি গুলশানের বাসা ফিরোজায় ফিরেন। সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে রওনা দিয়ে তিনি ৮টার দিকে বাসায় পৌঁছেন। এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় এবং গুলশানের বাসায় প্রবেশের সময় খালেদা জিয়াকে হাত নেড়ে স্বাগত জানান বিএনপি নেতাকর্মীরা।

খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বাসার উদ্দেশে বের হওয়ার আগে তার চিকিৎসকদের সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডাঃ ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ সিদ্দিকী জানান, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আপাত দৃষ্টিতে স্থিতিশীল। তবে যে কোন সময় তার রক্তক্ষরণের আশঙ্কা রয়েছে। তার শারীরিক যে অবস্থা তাতে যে কোন সময় অবনতি হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালে রাখলে করোনা ও ওমিক্রন সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে বলে সুরক্ষার স্বার্থে খালেদা জিয়াকে আপাতত বাসায় পাঠানো হচ্ছে। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার বড় ধরনের রক্তপাতের সম্ভাবনা আপাতত নেই। তবে বাসায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখে তার চিকিৎসা চলবে।

জানা যায়, শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় আরও কদিন আগে থেকেই বাসায় ফিরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু তার চিকিৎসা বোর্ডের অনুমতি না পাওয়ায় এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বাসায় যেতে পারেননি তিনি। অবশেষে মঙ্গলবার সকালে চিকিৎসা বোর্ড তাকে বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেয়। এরপর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা খালেদা জিয়াকে সন্ধ্যায় এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে যান।

এর আগে আরও ২ দফা এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও তৃতীয় দফায় খালেদা জিয়া এই হাসপাতালে ভর্তি হন ১৩ নবেম্বর। এর পর থেকে তিনি সিসিইউতে ছিলেন। হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ শাহাবুদ্দিন তালুকদারের অধীনে তার চিকিৎসা চলে। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ৯ জানুয়ারি তাকে নিবিড় সিসিইউ থেকে কেবিনে নেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া আথ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, হাইপারটেনশন, কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। সর্বশেষ এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে তিনি টানা ৮১দিন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রথম দিকে শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তখন তার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে দ্রুত বিদেশে পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু আইনী জটিলতার কারণে সরকার তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দিতে পারেনি।


গুলশানের বাসা ফিরোজায় গৃহকর্মী ফাতেমাসহ ৮ জন করোনায় আক্রান্ত হলে গতবছর ১০ এপ্রিল খালেদা জিয়ার করোনা পরীক্ষা করা হয়। ১১ এপ্রিল রিপোর্ট প্রকাশিত হয় তিনি করেনাভাইরাসে আক্রান্ত। এর পর থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ এফ. এম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে বাসায় থেকেই তিনি চিকিৎসা নেন। ১৫ এপ্রিল এক ঘণ্টার জন্য খালেদা জিয়াকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে সিটি স্ক্যান করানো হয়। রিপোর্ট ভাল আসায় ওইদিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি।


গতবছর ২৭ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে আবারও এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট ভাল না আসায় ওইদিনই তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় ৩ মে তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সিসিইউতে থাকা অবস্থায় ২৮ মে খালেদা জিয়া হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন। তবে ৩০ মে তার জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসে। নতুন করে বড় রকমের কোন সমস্যা না হওয়ায় ৩ জুন তাকে সিসিইউ থেকে কেবিনে নেয়া হয়। এভারকেয়ারে ভর্তি থাকা অবস্থায় ১৩ জুন আবারও জ্বরে আক্রান্ত হন খালেদা জিয়া। এরপর থেকে তার চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়ায় ১৯ জুন খালেদা জিয়াকে ৫৪ দিন পর হাসপাতাল থেকে গুলশানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

গতবছর ৮ জুলাই করোনার টিকা নেয়ার জন্য নিবন্ধন করেন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯ জুলাই তিনি মহাখালী শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে গিয়ে করোনার প্রথম ডোজ এবং ১৮ আগস্ট দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেন। ১১৫ দিন পর দ্বিতীয় দফায় ১২ অক্টোবর খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। তার শরীরের একটি অংশের চামড়া ফোসকার মতো (চাকা) হয়েছিল। এ জন্য ২৫ অক্টোবর এভারকেয়ার হাসপাতালে তার বায়োপসি করা হয়। ২ নবেম্বর খালেদা জিয়ার বায়োপসির নমুনা উন্নত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। উন্নত পরীক্ষার পর ওই দুই দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রিপোর্ট দেখিয়ে আরও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৭দিন চিকিৎসা নেয়ার পর ৭ নবেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানের বাসায় ফিরেন খালেদা জিয়া।

১৩ নবেম্বর তৃতীয় দফায় খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর থেকে বেশ কিছুদিন তিনি হাসপাতালের সিসিইউতে ছিলেন। তার লিভার ও পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের কারণে এক পর্যায়ে শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসার পর আস্তে আস্তে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিনে আনা হয়। এখনও তিনি সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।


২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ৫ বছরের কারাদন্ড নিয়ে কারাগারে যান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। পরে আপীলে কারাদ- দ্বিগুণ হয়। এর পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও খালেদা জিয়ার ৭ বছরের কারাদন্ড হয়। উচ্চ আদালতে জামিন করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর খালেদা জিয়ার স্বজনরা দেশে করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর সরকারের কাছে আবেদন করেন। এর পর সরকার নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ৬ মাসের জন্য দন্ড স্থগিত রেখে খালেদা জিয়াকে ৬ মাসের জন্য সাময়িক মুক্তি দেন। তার সাময়িক মুক্তির শর্তের মধ্যে রয়েছে বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং বিদেশে যাওয়া যাবে না। সাময়িক মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেল থেকে সরাসরি গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় গিয়ে অবস্থান করতে থাকেন তিনি। স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে পরে আরও ২ বার ৬ মাস করে তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাকে বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে স্বজনদের পক্ষ থেকে বেশ কবার আবেদন করা হলেও আইনগত জটিলতার কারণে সরকার সে সুযোগ দিতে পারেনি। তবে বিএনপি এর প্রতিবাদে রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে।