Home আঞ্চলিক ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও বাংলাদেশ বেতার

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও বাংলাদেশ বেতার

38

নাজমুল হক লাকি:

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ঘিরে বেতারকর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছিল এক অভূতপূর্ব উত্তেজনা। ৭ মার্চ ১৯৭১-এ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ রেসকোর্স ময়দান থেকে সরাসরি সম্প্রচারের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন ঢাকার বেতারকর্মীরা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরু হওয়ার সময় ছিল বেলা তিনটায়। দুপুর ১২টায় দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরু থেকেই বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল সে কথা। সেই সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছিল অসহযোগ আন্দোলনের স্লোগান ও দেশাত্মবোধক গান।

তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দশ লাখ মানুষতো ছিলই, পাশাপাশি সারা দেশের মানুষ অধীর আগ্রহ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দুপুর থেকে বসে ছিল রেডিও সেটের সামনে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণ প্রচারিত হলো না। দীর্ঘায়িত হলো উদ্বেগ-উৎকন্ঠার প্রহর। বাঙালির আশা-ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল মুজিব ভাই ঠিক আছেন তো! তাঁকে কি গ্রেফতার করলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী! এরকম নানা গুজব ছড়িয়ে পড়লো ঢাকার বাইরে।

এর আগে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কোনো কারণ ছাড়াই জাতীয় পরিষদের পূর্বনির্ধারিত ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাঙালি। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সর্বশ্রেণির মানুষের সঙ্গে সেদিন সাড়া দিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছয়টি বেতার কেন্দ্রের কর্মীরাও। ৪ মার্চ প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রেডিও পাকিস্তান’ বর্জন করে ঘোষণা করা হলো ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’। প্রচার শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলনের স্বপক্ষে অনুষ্ঠানমালা। একই সাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও খুলনা কেন্দ্র একই পদক্ষেপ অনুসরণ করে।

৭ মার্চ ১৯৭১! সকাল থেকে লাখ লাখ মানুষ শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, জনপদ, অলি-গলি থেকে রেসকোর্স ময়দানের দিকে ছুটে আসছে তো আসছেই! বাঙালির এ জাগরণ আগে কেউ কখনও দেখেনি। জনসভা শুরুর অনেক আগেই রেসকোর্স ময়দান জনসমুদ্র। মাথার উপর উড়ছে পাকিস্তানি সামরিক হেলিকপ্টার। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু দৃপ্তপায়ে উঠে এলেন রেসকোর্সের মঞ্চে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ-কাঁপানো সেøাগান আর মুহূর্মুহূ করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানালেন অপেক্ষমান জনতার উদ্দেশে। উত্তাল হয়ে উঠলো জনসমুদ্র। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারের জন্য রেসকোর্সের সেই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফ-উজ-জামান খান।

ঠিক সেই সময় শাহবাগ বেতার ভবনের ডিউটিরুমে একটি টেলিফোন এলো। টেলিফোনটি করেছেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক। বেতারে কর্তব্যরত অফিসারকে তিনি জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ভাষণ বেতারে প্রচার করা যাবে না। সাথে সাথে কন্ট্রোলরুম থেকে হটলাইনে সভার মঞ্চে কর্তব্যরত আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফ-উজ-জামান খানকে বিষয়টি জানানো হলো। তিনি কোনো ঘোষণা ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে সম্প্রচার বন্ধ করে বেতারকর্মীদের চলে যেতে বললেন। বেতারকর্মীরাও এই ঘোষণায় ফুঁসে উঠেছিলেন, তারাও সময়ক্ষেপন না করে বেতার ভবন ছেড়ে চলে গেলেন। ফলে নীরব-নিস্তব্ধ-অচল হয়ে পড়লো ঢাকা বেতার কেন্দ্র।

ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু ভাষণ শুরু করেছেন। আঞ্চলিক পরিচালক দ্রুত নেতার কাছে গিয়ে তাঁকে সামরিক কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার কথা জানালেন। এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের মধ্যেই একপর্যায়ে নির্দেশ দিলেন, ‘মনে রাখবেন রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না।’

মেজর সিদ্দিক সালিক পরবর্তীতে তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘সেই চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ হাজির হলো। মুজিবের ভাষণ দেবার কথা ছিল স্থানীয় সময় ২টা ৩০ মিনিটে। রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র মুজিবের ভাষণ নিজ উদ্যোগে সরাসরি প্রচারের ব্যবস্থা সম্পন্ন করে। রেডিওর ঘোষকরা আগে থেকেই রেসকোর্স থেকে ইস্পাত দৃঢ় লক্ষ দর্শকের নজিরবিহীন উদ্দীপনার কথা প্রচার করতে শুরু করল। এ ব্যাপারে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দফতর হস্তক্ষেপ করল এবং এই বাজে ব্যাপারটি বন্ধ করার নির্দেশ দিল। আমি বেতার কেন্দ্রে আদেশটি জানিয়ে দিলাম। আদেশটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনের অপর প্রান্তের বাঙালি বন্ধুটি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন, আমরা যদি সাড়ে সাত কোটি জনগণের কণ্ঠকে প্রচার করতে না পারি তাহলে আমরা কাজই করব না। এই কথার সাথে সাথে বেতার কেন্দ্র নীরব হয়ে গেল।’

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে সরাসরি প্রচার করা সম্ভব না হলেও মঞ্চে কর্তব্যরত বেতারকর্মীরা সম্পূর্ণ ভাষণ রেকর্ড করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ করলেন। স্বাধীনতার অমোঘ মন্ত্র বুকে নিয়ে যে যার মত ঘরে ফিরলো। উদ্বিগ্ন বেতার কর্মীরা আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফ-উজ-জামান খানের নেতৃত্বে এলিফ্যান্ট রোডে এক সহকর্মীর বাসায় জরুরি সভায় মিলিত হলেন। সিদ্ধান্ত হলো, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা না হলে বেতারের সব অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ থাকবে এবং নেতার নির্দেশ অনুযায়ী কোনো কর্মী বেতার কেন্দ্রে যাবেন না। তারপরও একটি সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। রেডিও পাকিস্তান ঢাকার স্টুডিও থেকে অনুষ্ঠান না পেলে ট্রান্সমিটার বা প্রেরণ কেন্দ্র থেকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রেকর্ড বাজিয়ে বেতারকেন্দ্র সচল রাখা যায়। সেটি আগে বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশ বেতারের সাবেক উপমহা পরিচালক আশফাকুর রহমান খান জানান, ‘তখন বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে তৃতীয় অধিবেশন শুরু হতো। সে মুহূর্তে সময় ছিল মাত্র ১৫ মিনিট। তখন সাভার প্রেরণ কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগব্যবস্থাও ছিল না। অবশেষে তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে ট্রাংককলে আঞ্চলিক পরিচালক সাভারের বেতারকর্মীদের অধিবেশন চালু না করে প্রেরণ কেন্দ্র ও আবাসিক কোয়ার্টার ত্যাগ করে দূরে চলে যেতে বলেন। তাঁরাও সেই নির্দেশ পালন করেছিলেন।’

এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ফলে সেদিন ঢাকা বেতার কেন্দ্রের তৃতীয় অধিবেশন, অর্থাৎ বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতের অনুষ্ঠান প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তৎকালীন দেশের উভয় অংশ এবং বহির্বিশ্ব ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে থাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি।

গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ বেতার কর্মীদের খুঁজে বের করেন এবং বেতারকেন্দ্র সচল করতে বৈঠকে বসেন। বেতার কর্মীরা পরদিন ৮ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের কোন প্রকার কাটছাট ছাড়া পুনঃ প্রচারের দাবি জানান এবং দাবি পূরণ হলে তারা কাজে ফিরে যাবেন বলে ঘোষণা দেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বেতারকর্মীদের সাথে আপোষ করতে বাধ্য হলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। পরে সিদ্ধান্ত হয়, বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার যে রেকর্ড করা হয়েছিল, তা বেতারে প্রচারিত হবে পরদিন সকালে। অবশেষে ৭ মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণ দেশবাসী শুনতে পেলো ৮ মার্চ একাত্তরে। সকাল ৮.৩০ মিনিটে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও খুলনা বেতার কেন্দ্র থেকে একযোগে প্রচারিত হলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৩২ নম্বর রোডের বাসভবনে ঢাকা কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে তাঁর ভাষণ শুনেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ পল্টনে ছাত্রলীগের সমাবেশে স্বাধীনতার কথা বললেও ৭ মার্চের ভাষণ রেডিওতে সম্প্রচারের কারণেই বেশি গুরুত্ব পায়। ৩ মার্চের ঘোষণা মানুষ জানতে পেরেছিল সংবাদপত্রের মাধ্যমে একদিন পর। তাও মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মানুষ। কিন্তু ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের ঐতিহাসিক সে ভাষণ ৮ মার্চ বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমেই পৌঁছে গিয়েছিল সারাদেশের আনাচে-কানাচে। গ্রাম-গ্রামান্তরের সুদূরতম প্রান্তে। দেশের প্রতিটি মানুষ শুনেছিল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বলিষ্ঠ, নির্ভীক, সাহসী উচ্চারণের জাগরণী সঙ্গীত। যার প্রতিটি শব্দে, বাক্যে বর্বর পাকিস্তানিদের শৃঙ্খল ভাঙার আবেগে-উচ্ছ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। মূলত: বেতারের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল।

 সেদিন বেতারের সাহসী কর্মকর্তা ও কর্মীরা জীবনের মায়া তুচ্ছ করে জাতির পিতার এ ভাষণকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাঙালির ঘরে ঘরে। বজ্রকন্ঠের এ ভাষণ বাষ্পে ভরা পাত্রের মত টগবগ করে ফুটেছিল বাঙালির হৃদয়ে। এ ভাষণ এমন এক প্রেরণা, এমন এক মায়াজড়ানো ঐন্দ্রজালিক আহবান-যার টানে মৃত্যুও মাথা নত করেছিল স্বদেশপ্রেমের কাছে।

এরপর ২৫ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিটি দিন ছয়টি বেতার কেন্দ্র থেকে এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিটি অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পূর্ণ অথবা নির্বাচিত অংশ প্রচার করা হয়। বেতারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বেতারে প্রচারের দাবিতে সেদিন যে বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার কাছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা প্রথমবারের মতো নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। (বেতার কর্মকর্তা আশরাফ-উজ-জামান খান ও আশফাকুর রহমান খানের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে এবং প্রতিবেদনটি তৈরীতে গুরুত্বপুর্ণ সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ বেতার খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক মো. বশির উদ্দিন)। লেখক : স্ক্রিপ্ট রাইটার, বাংলাদেশ বেতার।