Home Lead পানির সংকট, ভাঙন আর জলদস্যুর ত্রাস: প্রধানমন্ত্রীর দাকোপ সফর ঘিরে উপকূলবাসীর ৪...

পানির সংকট, ভাঙন আর জলদস্যুর ত্রাস: প্রধানমন্ত্রীর দাকোপ সফর ঘিরে উপকূলবাসীর ৪ প্রধান স্বপ্ন

0


শামীম আহমেদ, দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি।।

উপকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপের নলিয়ানে আগামী ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরকে কেন্দ্র করে গোটা অঞ্চলে উৎসুক আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির নতুন আশায় পথ চেয়ে আছেন অবহেলিত এই জনপদের মানুষ। উপকূলের সুপেয় পানির সংকট, যোগাযোগব্যবস্থার বেহাল দশা, নদীভাঙন এবং সুন্দরবনে ডাকাত আতঙ্কের মতো জীবন-জীবিকার নিত্যদিনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান চান তারা।

সুপেয় পানি ও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগ

উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট কতটুকু প্রকট, তা ফুটে ওঠে সুতারখালী পূর্বপাড়া এলাকার সন্ধ্যা ঘরামীর (৪৫) কথায়। পার্শ্ববর্তী কালীমন্দিরের পাশ থেকে কলসিতে পানি নিয়ে ফেরার পথে তিনি বললেন, আমাদের সুপেয় পানির সমস্যা তো আছেই, পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থাও করুণ। কাঁচা রাস্তা—শুকনো মৌসুমে ধুলো আর বর্ষার সময় কাদায় একাকার হয়ে চলাচলে প্রচুর দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

পানির এই তীব্র সংকট দাকোপের প্রায় প্রতিটা এলাকায় নিত্যদিনের গল্প। ভ্যানে করে তিন ড্রাম পানি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কালাবগী এলাকার মনিরুল গাজী (৪৫)। তিনি জানালেন, পানির খুব সংকট। আধ কিলোমিটার দূর থেকে ৫০ পয়সা লিটার দরে পানি কিনে আনছি। পরিবারে সাতজন সদস্য, এই তিন-চার ড্রাম পানিতে মাত্র ৫-৬ দিন চলবে।

নদীভাঙন, সড়ক যোগাযোগ ও চিকিৎসার অভাব

কালাবগী ঝুলন্ত পাড়ার চিত্র আরও করুণ। শিবসা নদীর মোহনায় বিলীন হয়ে গেছে শত শত বিঘা জমি। কালাবগীর বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বললেন, আমার জন্মের ৪৪ বছরে এই রাস্তা সাতবার ভাঙতে দেখেছি। শিবসার মোহনায় বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি। যোগাযোগব্যবস্থা বলতে গেলে নেই-ই। হঠাৎ কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে উপজেলা সদর হাসপাতাল পর্যন্ত নেওয়া মুশকিল। কয়েকদিন আগেই আমাদের এলাকার এক গৃহবধূ অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই দুঃখ নিজ চোখে দেখুন এবং তার হাত ধরেই যেন সমাধান হয়।

উপকূলীয় নারীদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি

সুন্দরবন উপকূলীয় এই বৈরী পরিবেশ ও পানির অভাবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ড. ইসমাইল আহমদের মতে, এখানকার অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবন বা নদীতে নেটজাল ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এই অঞ্চলের ৮০ শতাংশ মানুষের প্রধান সমস্যা বাতের ব্যথা ও শক্তিহীনতা। তাছাড়া নারীরা দীর্ঘসময় নদীতে মাছ ধরা বা গৃহস্থালি কাজে অপরিষ্কার পানি ব্যবহারের কারণে অধিকাংশ নারী জরায়ু সংক্রান্ত নানা জটিল রোগে ভুগছেন।

সুন্দরবনে জলদস্যুদের তাণ্ডব ও জেলেদের হাহাকার

অন্যদিকে, সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন আতঙ্কের নাম জলদস্যু বা ডাকাত চক্র। সুতারখালী এলাকার সুন্দরবননির্ভর জেলে ফারুক ফকির (৩২) ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সুন্দরবনের নাম শুনলে এখন গা কাঁপে! ডাকাতদের তাণ্ডবে বনে যাওয়ার পরিবেশ আর নেই। নৌকা নিয়ে বনে গেলেই বিকাশ খরচসহ দস্যুদের ২০ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। বনে বর্তমানে ৮ থেকে ৯টি ডাকাত দল সক্রিয়। টাকা না দিলে নির্মম মারধর করে। সুন্দরবনের আড়বানি খাল, কুমরোকাটি, আদা চাকি, হাড়বাড়িয়া ও শেকের টেকসহ বেশ কিছু খালে ওদের আস্তানা। এলাকা অনেকে এখন ডাকাতদের ভয়ে বনে যেতে চাইছে না, ফলে অভাব-অনটনে দিন কাটছে সুন্দরবননির্ভর পরিবারগুলোর।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি উপকূলবাসীর আকুল আবেদন

আইলা, আম্ফান ও রিমাদের আঘাত সয়ে বেঁচে থাকা দাকোপের সাধারণ মানুষ কোনো অনুদান বা সাময়িক ত্রাণ চান না। তারা চান টেকসই সাইক্লোন প্রতিরোধী বেড়িবাঁধ, পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার কঠোর পদক্ষেপ। উপকূলবাসীর বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর তাদের বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা দুঃখ-কষ্ট দূরীকরণে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সার্বিক বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু জানালেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য আগমনকে কেন্দ্র করে দাকোপজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে তিনি কি কারণে আসছেন স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে নলিয়ান এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে।

ইউএনও আরও জানালেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির সংকট, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে সরকার ইতিমধ্যে অবগত। এ ছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় জলদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ নজরদারি জোরদার রয়েছে। আমরা আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়েই দাকোপবাসীর দীর্ঘদিনের মৌলিক দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে।