দস্যুমুক্ত পরিবেশে বাড়ছে পর্যটন # তিন অর্থ বছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে
খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্যের বিপুল সমাহার আর ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলানো মায়াবী অরণ্য, সব মিলিয়ে পর্যটকদের কাছে সুন্দরবন এক অনন্য আকর্ষণ। ভোরের স্নিগ্ধ আলো, দুপুরের রোদ, পড়ন্ত বিকেলের মায়াবী পরিবেশ কিংবা নিশুতি রাতের গহিন অরণ্য, প্রতিটি মুহূর্তেই ভিন্ন রূপে ধরা দেয় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। তাই বর্ষা শেষে অক্টোবরের শুরু থেকেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সুন্দরবন। বনে দস্যুতা দমনে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি পর্যটন খাতের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়।
খুলনা অঞ্চল বন সংরক্ষকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে সুন্দরবন ভ্রমণে অনুমতি নেওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে মোট ১৩ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৫১ টাকা। এর মধ্যে ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয় ৩ কোটি ৬১ লাখ ৫ হাজার ৩৮৫ টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৩৮ লাখ ১২ হাজার ৪১০ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৬ টাকা।
বন বিভাগ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটকদের আগ্রহ এবং নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরও সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে পর্যটন সম্প্রসারণের পাশাপাশি বনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে সুন্দরবন ভ্রমণের অনুমতি নেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ২৯৩ জন দেশি ও ২ হাজার ৬২২ জন বিদেশি পর্যটক। এ ছাড়া তীর্থযাত্রী ছিলেন ১১ হাজার ৯৯৪ জন। ওই অর্থ বছরে মোট রাজস্ব আদায় হয় ৩ কোটি ৬১ লাখ ৫ হাজার ৩৮৫ টাকা।
২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে দেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ১৭ জন। ওই বছর বিদেশি পর্যটক ছিলেন ১ হাজার ৭৩৪ জন এবং তীর্থযাত্রী ১১ হাজার ৩৩ জন। এ সময়ে রাজস্ব আদায় হয় ৫ কোটি ৩৮ লাখ ১২ হাজার ৪১০ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে দেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৪২১ জন। বিদেশি পর্যটক ছিলেন ২ হাজার ২২৮ জন এবং তীর্থযাত্রী ১১ হাজার ৯৯৪ জন। এ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয় ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ২৫৬ টাকা।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে পর্যটক ও রাজস্ব, দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। পরের অর্থ বছরে দেশি পর্যটকের সংখ্যা ও রাজস্ব আয় আগের বছরের তুলনায় কমলেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে।
বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবন ভ্রমণে বন বিভাগ সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের অনুমতি দিয়ে থাকে। তবে ট্যুর অপারেটরদের অধিকাংশ প্যাকেজ দুই রাত তিন দিনের। ব্যক্তিগতভাবে জাহাজ বুকিং করেও সপ্তাহের যেকোনো দিন ভ্রমণের ব্যবস্থা করা যায়। তবে খুলনা থেকে অধিকাংশ পর্যটকবাহী জাহাজ বৃহস্পতি ও শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে যাত্রা শুরু করে।
সাধারণত, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পর্যটকদের জন্য আন্দারমানিক, কটকা, জামতলা বিচ, কচিখালী, ডিমের চর ও করমজলসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্দারমানিক, কটকা, জামতলা বিচ, হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চর ঘুরে দেখার সুযোগ থাকে। এক দিনের ভ্রমণে অনেকে বাগেরহাটের মোংলা থেকে ট্রলার বা ছোট নৌযানে করমজল ও হারবাড়িয়া এলাকায় যান। এ ছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকেও সুন্দরবনে প্রবেশ করা যায়।
সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি বন্য প্রাণী, নদী-খাল, ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এবং বনের স্বাভাবিক পরিবেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। অমাবস্যার অন্ধকার কিংবা চাঁদনি রাতের পরিবেশও পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের ভিন্ন এক রূপ তুলে ধরে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) তথ্যমতে, বর্তমানে খুলনা থেকে প্রায় ৭০টি জাহাজ সুন্দরবনে পর্যটক নিয়ে যায়। এসব জাহাজের মধ্যে বিলাসবহুল নৌযানও রয়েছে। একটি জাহাজে সর্বোচ্চ ৭৫ জন পর্যটক নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে বিলাসবহুল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত জাহাজে জনপ্রতি ব্যয় ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। নন-এসি জাহাজে জনপ্রতি খরচ ৭ হাজার ৫০০ থেকে ১১ হাজার টাকা।
জাহাজভেদে খাবার, আবাসন ও অন্যান্য সুবিধার তারতম্য হয়। পর্যটন মৌসুমে পছন্দের জাহাজে ভ্রমণ নিশ্চিত করতে অন্তত দুই থেকে চার সপ্তাহ আগে ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণত বুকিং নিশ্চিত করতে মোট ভাড়ার কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অগ্রিম দিতে হয়।
সুন্দরবনে পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও ট্যুর অপারেটররা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। বনের পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সভাপতি মো. মইনুল ইসলাম জমাদ্দার বলেন, ১৯৮৭ সালে সুন্দরবনকে পর্যটকদের জন্য উন্মৃক্ত করার পর থেকে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার সুন্দরবনের মধ্যে পর্যটকরা ভ্রমন করতে পারে মাত্র ১০-১২ কিলোমিটার। এই পর্যন্ত ভ্রমনপিয়াসুরা নিরাপদে ভ্রমন করেছে সুন্দরবন। আমরা পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। বন বিভাগের সব নিয়মকানুন ও বিধিমালা মেনে সুন্দরবনে চলাচল করতে দর্শনার্থীদের অনুরোধ করি। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। খুলনাতে বিশ্বমানের জাহাজ সংযুক্ত হয়েছে। আমরা পরিবেশকে বাঁচিয়ে বিশ্বমানের ট্যুরিজমের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান হোসেন বলেন, বন বিভাগ সার্বক্ষণিক সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, প্রতিটি পর্যটকবাহী বোটে বন বিভাগের দুজন করে সশস্ত্র গার্ড থাকেন। পাশাপাশি ট্যুর অপারেটরের প্রতিনিধিরাও থাকেন। বনের মধ্যে বন বিভাগের প্রতিটি ক্যাম্পকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন করা হচ্ছে এবং বন সংরক্ষণে দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন খাতের বিস্তার স্থানীয় অর্থনীতি ও সরকারের রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বনের পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই নিয়ন্ত্রিত পর্যটন, নিয়মিত নজরদারি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন বিভাগের বিধিনিষেধ যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের অনন্য আধার সুন্দরবনকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখতে পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।










































