মিলি রহমান
আজকের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তথ্যের গতি এখন আলোর থেকেও দ্রুত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ গতি যেমন ইতিবাচক সংবাদ ছড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি মুহূর্তের মধ্যে মিথ্যা, গুজব ও রটনাও বহুগুণে বিস্তার লাভ করতে সক্ষম। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ভেতর থেকেই কিছু লোক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করছেন দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য। তারা হয়ত সচেতনভাবে, নয়ত ব্যক্তিগত স্বার্থে কিংবা প্রতিহিংসায় দলের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করছেন। ফলে বিএনপিকে যেমন বহিরাগত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তেমনি নিজেদের ভেতরের বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের সাথেও লড়াই করতে হচ্ছে।
দলের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি: কোনো রাজনৈতিক দল যখন অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্য হারায়, তখনই বাইরে থেকে আঘাত করার সুযোগ তৈরি হয়। বিএনপির ক্ষেত্রে বিষয়টি এখন আরও জটিল। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য ভুয়া বা অর্ধসত্য খবর ছড়ানো হচ্ছে, যেখানে অনেক সময় দলের নাম ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে। ভোটাররা বিভ্রান্ত হচ্ছেন, সমর্থকেরা হতাশ হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে দলের প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়া।
আভ্যন্তরীণ শত্রু বাইরের চেয়েও বিপজ্জনক: ইতিহাস সাক্ষী-কোনো আন্দোলন বা দল ভেঙে পড়েছে বাইরের আক্রমণে নয়, ভেতরের দুর্বলতা ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। বিএনপির জন্যও আজ বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজেদের ভেতরের কিছু ব্যক্তির কার্যকলাপ। তারা বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা অভিযোগ, অসত্য তথ্য, কিংবা ইচ্ছাকৃত কটূক্তি করে দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছেন। বাইরের সমালোচককে মোকাবিলা করা সহজ, কিন্তু ভেতরের শত্রুর হাত থেকে দলকে রক্ষা করা অনেক কঠিন।
ব্যক্তিগত স্বার্থ বনাম দলীয় স্বার্থ: অনেকে ব্যক্তিগত পদ-পদবি কিংবা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার জন্য দলের স্বার্থকে গৌণ মনে করছেন। কেউ হয়তো কোনো মনোনয়ন না পাওয়ার কারণে, কেউ হয়তো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হেরে গিয়ে প্রতিশোধ নিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে সাধারণ সমর্থকের মনে প্রশ্ন জাগছে-দলের আসল চেহারা কি তবে এমন? এ প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।
সমাধানের পথ কোথায়?: প্রথমত, বিএনপিকে নিজেদের ভেতরে একটি শক্তিশালী তথ্য-নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করতে হবে, যারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং মিথ্যা তথ্যকে নিরপেক্ষভাবে খণ্ডন করবে। দ্বিতীয়ত, যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে রটনা ছড়াচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু বক্তব্য বা বিজ্ঞপ্তি দিলেই চলবে না; বাস্তব পদক্ষেপই আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তৃতীয়ত, দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে যে-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ মানেই দলের ক্ষতি, আর দলের ক্ষতি মানেই নিজের ভবিষ্যতের ক্ষতি।
সবশেষে, বিএনপিকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা না থাকলে বড় দল টিকে থাকতে পারে না।
উপসংহার: বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘ এবং সংগ্রামী। সেই যাত্রায় বারবার দল বহিঃশত্রুর আঘাত সয়েছে, দমন-পীড়ন মোকাবিলা করেছে। কিন্তু আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজের ভেতরের দায়হীন লোকদের হাত থেকে দলকে রক্ষা করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রটনা ছড়ানো হয়তো মুহূর্তের চাঞ্চল্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে দলকে দুর্বল করে দেয়। বিএনপিকে যদি আগামীতে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হয়, তবে আজই প্রয়োজন ভেতরের অস্থিরতা বন্ধ করে সত্য, ঐক্য ও শৃঙ্খলার পথে দৃঢ়ভাবে হাঁটা। লেখক: সংবাদকর্মী









































