মো: মেহেদী হাসান।।
২৭ মে ২০২৩ একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায় যে চার বছরে মাদারীপুর জেলায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করতে যেয়ে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কেউ কেউ দালালের খপ্পরে পড়ে নির্যাতন ও বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। অবৈধ অভিবাসন সারাবিশ্বেই বর্তমান যুগের একটি চ্যালেঞ্জ। মূল:ত অপেক্ষাকৃত গরিব দেশ থেকে ধনী দেশে ভালো বেতন ও জীবিকার আশায় মানুষ অভিবাসী হওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ থেকে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন এবং কাজ করছেন সেসব প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২১০৩ কোটি ডলার। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেক অভিবাসী সঠিকভাবে বিদেশে না যাওয়ার ফলে মাঝে মাঝে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিবাসীদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে দালালেরা তাদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেন। এক্ষেত্রে নারী অভিবাসীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। একটি সমীক্ষায দেখা যায় ২০১৭ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৭০৯ জন বাংলাদেশী মহিলা অভিবাসী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিক যারা অভিবাসী হতে ইচ্ছুক তারা যদি একটু সচেতন হন তবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা খুব সহজেই এড়াতে পারেন। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার অভিবাসীদের মঙ্গলের জন্য সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো নিরাপদ অভিবাসনের জন্য প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও নানারকম পদক্ষেপ নিচ্ছে। একজন পুরুষ বা নারী অভিবাসী যদি কিছু সাধারন নিয়ম-নীতি মেনে চলেন তবে তার অভিবাসন প্রক্রিয়াটি অনেক স্বচ্ছ এবং বিপদ মুক্ত হতে পারে।
যেমন প্রথমেই একজন অভিবাসীকে অবশ্যই বৈধ পাসপোর্টধারী হতে হবে। একজন অভিবাসীকে অবশ্যই সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যেতে হবে। সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহের তালিকা জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস অথবা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ওয়েবসাইট থেকে সহজেই পাওয়া যাবে। একজন অভিবাসী যে দেশে যেতে ইচ্ছুক সে দেশের ভাষা ও কাজের দক্ষতা অর্জনের জন্য তার নিকটস্থ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। এখানে উল্লেখ্য যে সারাদেশে মোট ১১০ টি বিআইএমটি, আইএমডি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এর মাধ্যমে সরকার অভিবাসীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রেখেছে। চাকরি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই একজন অভিবাসীকে দালাল বা মধ্যস্থতাকারির শরণাপন্ন হওয়া যাবে না। তাহলে তার অর্থ অপচয় ও মানবপাচারের ঝুঁকি রয়েছে। একজন অভিবাসীকে অবশ্যই তার নিকটস্থ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস হতে রেজিস্ট্রেশন ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট করতে হবে। ভিসা ও চুক্তিপত্রের যথার্থতা যাচাই করে জেনে-বুঝে চুক্তিপত্রে সই করতে হবে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো হতে বহির্গমণ ছাড়পত্র (স্মার্ট কার্ড) নিতে হবে। তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যতীত সমুদ্রপথে বা অন্য কোন পথে বিদেশ গমন করা যাবে না। কোন অভিবাসির আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর শরণাপন্ন না হয়ে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন।
বিদেশ যাত্রাকালে বিমানবন্দরে কোন সহায়তার প্রয়োজন হলে একজন অভিবাসী বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক থেকে সহায়তা পেতে পারেন। সুতরাং একথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে একজন অভিবাসী যদি সচেতন হোন এবং তিনি বর্তমান সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও এর অধীন জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরো হতে সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কার্যসম্পাদন করেন, তবে তার পাচার হয়ে যাওয়া বা দালালের খপ্পরে পড়ে মৃত্যুঝুকিতে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কমে যায়। সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এর অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো আগস্ট ২০২১ সাল পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লক্ষ ৯২ হাজার ৭৪৩ জনকে সঠিকভাবে বিদেশের শ্রম বাজারে প্রেরণ করতে পেরেছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬ টি দেশে বৈধভাবে বাংলাদেশ হতে কর্মী প্রেরণ করা হচ্ছে। সারাদেশে ৬ টি আইএমটি (ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি) এবং ৬৪ টি টিটিসি (টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার) এর মাধ্যমে অভিবাসীদের মোট ৫৫ টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে ১৫৬৩ টি (২০২১-২২) বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বৈদেশিক বাজারে কর্মী প্রেরণ করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদেশগামী ও বিদেশ ফেরত কর্মীদের জন্য বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বিদেশগামী কর্মীদের ডাটাবেজে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ চালু করা হয়েছে। অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ, গতিশীল ও সুশৃঙ্খল করতে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০১৬ সহ আরও অনেক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। শুধু তাই নয়, বিদেশে কর্মরত নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে বিএমইটি (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) তে ঈড়সঢ়ষধরহঃ গধহধমবসবহঃ ঈবষষ ভড়ৎ ঊীঢ়ধঃৎরধঃব ঋবসধষব ডড়ৎশবৎং নামে একটি সেল গঠন করা হয়েছে। বিদেশগামী ও প্রবাসী কর্মীদের সমস্যা সমাধানে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এর তত্ত্বাবধানে ‘প্রবাস বন্ধু’ কল সেন্টার চালু করা হয়েছে।
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশী কর্মীদের বিদেশ ভ্রমণ নিরাপদ ও সহজ করতে বর্তমান সরকার সবসময় সচেষ্ট। অনিরাপদ অভিবাসন ও দুর্ঘটনা ঘটছে মূলত অভিবাসন প্রত্যাশীদের সচেতনতার অভাব এবং দুষ্টু দালালচক্রের অসৎ উদ্দেশ্যের কারনে। যেহেতু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ আসে অভিবাসী কর্মীদের দ্বারা সুতরাং বর্তমান সরকারের এসব পদক্ষেপের কারনে এদেশের বৈদেশিক কর্মীরা নিরাপদে বিদেশে পাড়ি জমাতে পারবে এবং তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দ্বারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখবে এ আশাবাদ ব্যক্ত করাই যায়।
লেখক: মো: মেহেদী হাসান, সিনিয়র তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা। তাং ৩১-০৫-২০২৩









































