যশোর অফিস।।
‘যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান’- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপরিউক্ত পঙক্তিতে সেই চিত্র ধরা পড়েছে বাঘারপাড়া উপজেলার ৮ নম্বর বাসুয়াড়ী ইউনিয়নের সবুজের সমরহে ঘেরা বাসুয়াড়ী গ্রামের পশ্চিম পাড়ায়।
সরেজমিন দেখা যায়, একই জমিতে মসজিদ-মন্দির। একদিকে চলছে নামাজ, অন্যদিকে চলছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সব থেকে বড় উৎসব দুর্গাপূজার পূজা-অর্চনা।
স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে, অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছেন এখানকার হিন্দু-মুসলমানরা। যেখানে নেই কোনো জাতিগত বিভেদ, নেই কোনো ধর্মীয় পার্থক্য। সামাজিক সহাবস্থান এতই মধুর হয়ে গড়ে উঠছে যেন সবাই এক জাতি, একই পরবিার। আজানের ধ্বনি শুনে মুসলিম যাচ্ছে মসজিদে, হিন্দু যাচ্ছে মন্দিরে পুজো দিতে।
বাসুয়াড়ীর পশ্চিম পাড়া একই জমিতে মসজিদ ও মন্দিরের যে সম্প্রীতি রয়েছে তা মানুষের কাছে এক নজির স্থাপন করেছে। একপাশে ধূপকাঠি ও অন্যপাশে আতরের সুঘ্রাণ। এক পাশে উলুধ্বনি, অন্যপাশে চলে মসজিদে প্রার্থনা। এভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কয়েক যুগ ধরে চলে আসছে পৃথক দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়। তবে নিজেদের নীতিনৈতিকতা ও সচেতনতায় মসজিদের আজান ও নামাজের সময়ে মন্দিরের ঢাক-তবলা ও উলুধ্বনি বন্ধ রাখেন পূজা-অর্চনাকারীরা।
মন্দিরটিতে ৫ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের শুরু হয় গত শুক্রবার থেকে। শনিবার মহাসপ্তমী পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। কোনো ধরনের ঝগড়া, বাগ্বিতণ্ডা, অভিযোগ বা অনুযোগ ছাড়াই যুগের পর যুগ ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরে বিরাজ করছে ধর্মীয় সম্প্রীতি। পৃথিবীজুড়ে চলমান সহিংসতা আর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সংবাদের মধ্যে এমন দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির স্থাপন করেছে ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত।
মন্দিরটিতে দুর্গা ও বিভিন্ন দেবতাদের মূর্তিতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় স্বাভাবিক নিয়মে চলছে পূজা-অর্চনা। প্রতিবছর জাঁকজমক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। একই আঙিনার জামে মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতে দূরদূরান্ত থেকেও মুসল্লিরা আসেন।
মসজিদের মুসল্লি মুজাফফর হোসেন জানান, ১৯৬৫ সালের দিকে ভারতীয় মুসলিমরা এ অঞ্চল এসে জামে মসজিদটি নির্মাণ করেন। ওই সময় মসজিদের পাশে ‘বাসুয়াড়ী পশ্চিমপাড়া ইউনাইটেড ক্লাব’ নামে একটি ক্লাবঘর ছিল। ক্লাবটি পরিচালিত করত এলাকার হিন্দু যুবকরা। পরে তারা ক্লাবঘরটি মন্দিরে রূপান্তর করেন। সেই থেকেই মূলত পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরে উভয় ধর্মের শান্তিপ্রিয় মানুষ নিজ নিজ উপাসনালয়ে ধর্ম পালন করে আসছেন।
মসজিদের সভাপতি মোতালেব বলেন, ‘একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। যে যার ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করে। কেউ কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ নেই। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আজান ও নামাজের সময় ঢাকঢোল বন্ধ রাখেন। এই সম্প্রীতির চিত্র স্বচক্ষে দেখার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। অনেক সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে দর্শনার্থীরা ঐতিহ্যবাহী ওই মসজিদ ও মন্দির সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। আমরাও তাদের সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করি না। প্রয়োজনে তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকি।’
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত কুমার দাস বলেন, ‘ছোটোবেলা থেকেই এখানে মসজিদ এবং মন্দির দেখে আসছি। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নির্বিঘ্নে মন্দিরটিতে নিয়মিত পূজা-অর্চনা করেন। তবে দুর্গাপূজার সময় মন্দিরটি সাজানো হয় এবং অনেক লোকজনের সমাগম ঘটে। পাশে মসজিদ থাকায় আজান ও নামাজের সময় ঢাকঢোল বন্ধ রাখা হয়। পাশের মসজিদে মুসল্লিরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। মসজিদ বা মন্দিরের কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ বা অনুযোগ নেই।’
বাঘারপাড়া থানার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নাজমুল হাসান বলেন, ‘এ উপজেলায় ৯২ টি মন্দিরে দুর্গাপূজা হচ্ছে। সেই হিসেবে বলা যায় এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে। হিন্দু-মুসলমান সহাবস্থানে থেকে দীর্ঘদিন সম্প্রীতি বজায় রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘একই জমিতে মসজিদ-মন্দির থাকাতেও এ পর্যন্ত কোনো পক্ষের থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ বা অনুযোগ শোনা যায়নি। এটা অসাম্প্রদায়িকতার দেশের একটা রোল মডেল। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি। একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির সত্যই বিরল। যেখানে কোনো ধরনের ভেদাভেদ বা বিদ্বেষ ছাড়াই পাশাপাশি উদযাপিত হচ্ছে দুই ধর্মের প্রার্থনা ও উৎসব।’










































