Home স্বাস্থ্য নিম গাছের যত গুণ

নিম গাছের যত গুণ

1


মিলি রহমান।।


চারপাশে সহজেই দেখা মেলে নিমগাছের। তেতো স্বাদের এই গাছটি বহুদিন ধরে বাংলার লোকজ ও ভেষজ চর্চায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিমের পাতা, ছাল, ফল, বীজ ও তেল—বিভিন্ন অংশের রয়েছে নানা ব্যবহার। বিশেষ করে ত্বকের পরিচর্যা, চুলের যত্ন এবং কিছু পোকামাকড় দূরে রাখতে নিমের ব্যবহার পরিচিত।

তবে নিমের সব প্রচলিত ব্যবহার যে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, তা নয়। তাই এর উপকারিতা জানার পাশাপাশি সঠিক ব্যবহার ও সতর্কতা সম্পর্কেও ধারণা রাখা জরুরি।

নিমগাছের এত কদর কেন?

নিম একটি বহুবর্ষজীবী, চিরসবুজ গাছ। অনুকূল পরিবেশে এটি ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজেই এই গাছ জন্মে। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম আজাদিরাকটা ইন্ডিকা।

আরও পড়ুন

বিয়ে নিয়ে ১২ বাস্তব সত্য, যা কেউ আগে থেকে বলে না

নিমের বিভিন্ন অংশে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যেগুলো নিয়ে জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ, প্রদাহ কমানো এবং পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গবেষণা হয়েছে। এ কারণে ভেষজ উপাদান, প্রসাধনী ও কিছু কীটনাশক তৈরিতে নিম ব্যবহার করা হয়।

নিমের কাঠও বেশ শক্ত। পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন কাজে এই কাঠ ব্যবহৃত হয়।

ত্বকের যত্নে নিমের ব্যবহার

ব্রণ, চুলকানি ও ত্বকের অস্বস্তিতে নিমপাতা ব্যবহারের প্রচলন দীর্ঘদিনের। নিমের কিছু উপাদানের জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা থাকলেও ব্রণ বা ত্বকের সব ধরনের সংক্রমণ সারাতে নিম কার্যকর—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

ত্বকের পরিচর্যায় নিমযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করতে চাইলে উপাদান ও ব্যবহারের নির্দেশনা দেখে নেওয়া ভালো। কাঁচা নিমপাতা বেটে সরাসরি মুখে লাগালে কারও কারও ত্বকে জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জি হতে পারে। তাই প্রথমে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করা এবং অস্বস্তি হলে ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।

খোসপাঁচড়া, দাদ, একজিমা বা দীর্ঘদিনের চুলকানি হলে শুধু নিমের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

নিম গাছের যত গুণ

খুশকি ও চুলের যত্নে নিম

মাথার ত্বকে চুলকানি ও খুশকির সমস্যায় নিমপাতা সেদ্ধ পানি ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। নিমের কিছু উপাদানের ছত্রাকবিরোধী বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা হলেও খুশকি দূর করা বা চুল পড়া বন্ধ করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত নয়।

চুলের যত্নে নিমযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মাথার ত্বকে ক্ষত, তীব্র চুলকানি বা দীর্ঘদিনের খুশকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। চুল পড়ার কারণও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।

দাঁত ও মাড়ির পরিচর্যায় নিমের ডাল

গ্রামবাংলায় কচি নিমের ডাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কারের প্রচলন রয়েছে। নিমের কিছু উপাদান মুখের জীবাণুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণা হয়েছে। তবে নিমের ডাল ব্যবহার করলেই দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগ বা ব্যথা প্রতিরোধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখতে দিনে দুবার ফ্লুরাইডযুক্ত দাঁত মাজার পেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা জরুরি। দাঁতে ব্যথা, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বা দাঁত নড়ার সমস্যা হলে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

পোকামাকড় দূরে রাখতে নিম

নিমের বীজ ও তেলে থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে নিম থেকে তৈরি নির্দিষ্ট উপাদান কৃষিকাজে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তবে নিমপাতা ঘরে ছড়িয়ে রাখা বা নিমের পানি স্প্রে করলেই মশা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যাবে, এমন প্রমাণ নেই। মশার উপদ্রব কমাতে জমে থাকা পানি সরানো, মশারি ব্যবহার এবং অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা বেশি নির্ভরযোগ্য উপায়।

ডায়াবেটিস, ওজন ও হজমের সমস্যায় কি নিম উপকারী?

নিমপাতা রক্তে শর্করা কমাতে পারে কি না, তা নিয়ে কিছু প্রাথমিক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো, কৃমি দূর করা কিংবা হজমের সমস্যা সারাতে নিমপাতার রস বা নিমের চা নিয়মিত খাওয়ার পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধের সঙ্গে নিম খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিমপাতার রস বা অন্য কোনো নিমজাত উপাদান খাওয়া উচিত নয়।

জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, ভাইরাসজনিত রোগ, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া কিংবা বুকের ব্যথার মতো সমস্যায় নিমকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করাও বিপজ্জনক। এসব ক্ষেত্রে রোগের কারণ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন।

নিম ব্যবহারে যেসব সতর্কতা জরুরি

নিম প্রাকৃতিক উপাদান হলেও সব সময় নিরাপদ নয়। বিশেষ করে নিমের তেল বা ঘন নির্যাস ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিমের তেল বা ঘন নির্যাস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
গর্ভবতী নারী, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এমন ব্যক্তি এবং শিশুর ক্ষেত্রে নিমজাত উপাদান ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
>ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ খেলে নিম খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
>ত্বকে নিম ব্যবহারের পর জ্বালাপোড়া, ফুসকুড়ি বা অ্যালার্জি দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
>কোনো রোগের চিকিৎসা, নির্ধারিত ওষুধ বা টিকার বিকল্প হিসেবে নিম ব্যবহার করবেন না।

উপকারী গাছ, তবে ব্যবহারে চাই সচেতনতা

নিমগাছের পাতা, ছাল, বীজ, তেল ও কাঠের বিভিন্ন ব্যবহার রয়েছে। ত্বক ও চুলের পরিচর্যা থেকে শুরু করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিমের উপাদান কাজে লাগানো হয়। তবে লোকজ বিশ্বাস আর বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

তাই নিমের উপকারিতা নিতে হলে নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে জানা জরুরি। প্রাকৃতিক উপাদান বলে সবকিছু নির্বিচারে ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।