Home Lead ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০, আহত ৯

ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০, আহত ৯

1

গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণের শঙ্কা, ছিলনা অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। আগুনে তিনতলা রিসোর্টটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেকের রিসোর্টটিতে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। পরে রিসোর্টের ভেতর থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ নিহতের সংখ্যা ১০ এবং আহতের সংখ্যা ৯ বলে জানাগেছে। তবে হতাহতদের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যেভাবে ভয়াবহ দুর্ঘটনা

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটিতে ১৮-২৩জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কয়েকজন জানালা ভেঙ বের হতে পারলেও অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। আগুনের তীব্রতায় রিসোর্টের ভেতরের অংশ পুড়ে যায়। উদ্ধারকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর বিভিন্ন কক্ষ তল্লাশি করে মরদেহ উদ্ধার করেন।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, নিচতলার রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।

কাঠের অবকাঠামোয় ছড়িয়ে পড়ে আগুন

সরেজমিনে দেখা গেছে, মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত তিনতলা রিসোর্টটির বাইরের কাঠামো পাকা হলেও ভেতরের দেয়াল ও মেঝের বড় অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগে পরিদর্শনে রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্ক করা হয়েছিল। এ তথ্য সত্য হলে, সতর্কতার পরও কীভাবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিহতদের পরিচয় শনাক্ত

অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে এ পর্যন্ত ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মদ।

অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২) রয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান এবং উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন।

ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রিমন ঘোষ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। রিসোর্টের ভেতরে আর কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।

এসপি এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দীর্ঘক্ষণ অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, নারী ও পুরুষের পার্থক্য নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

অভিজ্ঞ মহলের শঙ্কা-

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর অল্প সময়ের মধ্যে তিনতলা ভবনটি যেভাবে পুড়ে গেছে, তা সহজে বোধগম্য নয়। এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো ধরনের নাশকতা রয়েছে—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় পর্যটন এলাকাকে আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অবহেলা ও অক্ষমতার কারণে এলাকাটি ক্রমেই ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে, উখিয়া-টেকনাফের পর্যটন এলাকায় যথাযথ পরিকল্পনা, অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে ওঠার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং গ্যাস সংযোগ নিয়মিত পরিদর্শন করা জরুরি।

এ বিষয়ে এবি পার্টির নেতা শামসুল হক শারেকসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, পর্যটন এলাকার পরিকল্পিত প্রতিষ্টান গরে তোলা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত তদারকি এবং নিরাপত্তা বিধি বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে। তারা দুর্গটনা কবলিত রিসোর্ট মালিককে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনারও দাবী জানা।

প্রয়োজন কঠোর নজরদারি

ইনানীর এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড পর্যটন এলাকার হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।