Home Lead খুলনায় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির কার্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন আস্তানা!

খুলনায় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির কার্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন আস্তানা!

22


স্টাফ রিপোর্টার।।


খুলনা নগরীর ৩০৪, খানজাহান আলী রোড। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এক বাণিজ্যিক ভবন, যার দরজায় ঝুলছে ‘খুলনা খাদ্য পরিবহন সড়কপথ পরিবহন ঠিকাদার সমিতি’ (নিবন্ধন নম্বর: কে এল এন–৯৩৬)-এর অফিশিয়াল সাইনবোর্ড। কিন্তু ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার এই নিবন্ধিত কার্যালয়টিকে ঘিরে খুলনা ও পার্শ্ববর্তী জেলা সাতক্ষীরার রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠেছে তোলপাড় করা অভিযোগ। অভিযোগ উঠেছে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পটপরিবর্তনে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন কোণঠাসা হয়ে পড়ার পর, এই বাণিজ্যিক কার্যালয়টিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের নিরাপদ আস্তানা ও বিকল্প সাংগঠনিক ঘাঁটি হিসেবে।


অনুসন্ধানে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়গুলো জনশূন্য ও তালাবদ্ধ হয়ে পড়লে, কৌশলে ব্যবসায়িক সমিতির আড়ালে রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার এই বিকল্প ছক কষা হয়। খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কার্যালয়কে দলীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহারের নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করছেন ২৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং সাতক্ষীরার খাজরা ইউনিয়নের সভাপতি আলহাজ্ব অহিদুল ইসলাম। সাধারণ ব্যবসায়ীদের আড়ালে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা গোপনে সুবিধাবাদী নেতাকর্মীদের সংঘটিত করছেন বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে।


সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি উঠে এসেছে, তা হলো আলোচিত এই কার্যালয়টিতে নিয়মিত যাতায়াত ও গোপন বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন ‘শেখ বাড়ির ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী হাফিজুর রহমান। শুধু তা-ই নয়, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের ভাগ্নে পরিচয়দানকারী মোহাম্মদ সেলিম ওরফে সেলিম রেজাও এই গোপন নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার হিসেবে কার্যালয়টিতে যাতায়াত করছেন।


তদন্তে ও স্থানীয় সূত্রে আরও যাঁদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ্যে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোস্তফা কামাল খোকন, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক মাকসুদ আলম খাজা, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরে আলম সিদ্দিকী, ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন, দৌলতপুর থানা যুবলীগের সাবেক নেতা রিপন হাওলাদার, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম।


অভিযোগ উঠেছে, দিনের আলোয় সমিতির নিয়মিত ব্যবসায়িক কাজের বাহানা থাকলেও সন্ধ্যা নামলেই সেখানে বদলে যায় দৃশ্যপট। সাধারণ চালক কিংবা ঠিকাদারদের অজান্তে ঘরের পেছনের অংশে বসে রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সেখানে পলাতক নেতাকর্মীদের আইনি ও আর্থিক সুরক্ষার কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি বিভিন্ন গোপন চক্রান্ত পরিচালিত হচ্ছে। একটি অনুমোদিত পরিবহন ঠিকাদার সমিতির কার্যালয় কীভাবে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আস্তানা হতে পারে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতন মহল। তাঁদের মতে, এ ধরনের বেআইনি তৎপরতা কেবল পেশাদার ব্যবসায়িক পরিবেশকেই ব্যাহত করছে না, বরং নগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


নাগরিক নেতারা বলেন, বাণিজ্যিক বা সামাজিক সংগঠনের কার্যালয়ে অরাজনৈতিক অথবা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের গোপন সভা পরিচালনা সম্পূর্ণ আইনি বিধানের লঙ্ঘন। এ বিষয়ে অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের যৌথ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। সরেজমিনে অভিযান পরিচালনা ও খতিয়ে দেখার মাধ্যমে সমিতির প্রকৃত ভূমিকা উদ্ঘাটন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।