Home জাতীয় কৃত্রিম সংকট তৈরি, ভোজ্যতেলের দাম আবার উর্দ্ধমুখী

কৃত্রিম সংকট তৈরি, ভোজ্যতেলের দাম আবার উর্দ্ধমুখী

8


ঢাকা অফিস
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফের ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছে ব্যবসায়ীরা। ফলে দেশের কোনো কোনো জায়গায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়েও বেশি দরে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসের মাঝামাঝি থেকেই এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। শুধু এই নয়, কোনো কোনো জায়গায় বোতলজাত ভোজ্যতেলই পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ-বা এক বোতলের বেশি ভোজ্যতেল বিক্রি করছেন না। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই ভোক্তাদের খুচরা বাজারে লিটারে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে রাজধানীর চেইনশপগুলোতে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম থাকায় এক বোতলের বেশি বিক্রি করা হচ্ছে না।
জানা গেছে, বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। পাঁচ লিটার ৯২০ থেকে ৯৫৫ টাকা। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে এ দর চলছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক সপ্তাহে পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের দাম ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯৫০-৯৫৫ টাকায়। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ৭ থেকে ১০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৮৫-১৯৩ টাকা দরে। অন্যদিকে খোলা পাম তেলের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ১৩ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ১৬৩-১৬৮ টাকা দরে।
মুদি ব্যবসায়ী আকবর আলী বলেন, ‘ডিলারদের কাছ থেকে আমরা তেল পাচ্ছি না। ফলে ভোক্তার কাছেও বিক্রি করতে পারছি না।’ অবশ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে বলে তারা সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী একটি কোম্পানির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা তেল সরবরাহ করছেন। বাজারে সংকট থাকার কথা নয়। তবে ভোজ্যতেলের আমদানি যথেষ্ট নয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ভোজ্যতেল নিয়ে এবার যেটা হচ্ছে তা আসলে সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য। এটা যে তাদের পুরনো কৌশল, সরকারকে তা বুঝতে হবে। এ জন্য মাঠ প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে কাজ করতে হবে সরকারকে।
‘মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত : ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত পর্যালোচনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা শেষে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারে অনেক ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য দামের ব্যবধান দেখা যায়। এই ব্যবধানের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, প্রশাসনের সদস্য এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য পেশাজীবীদের নিয়ে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও আমদানিনির্ভর দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বা পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে এর প্রভাব দেশের বাজারে পড়া স্বাভাবিক। তবে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণজনিত কোনো কারণে যেন পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি না পায় সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
তিনি জানান, চলতি রমজান মাসে ভোজ্যতেলের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে, যা গত কয়েক দশকের তুলনায় ইতিবাচক উদাহরণ। তবে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রবণতার বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত শোনার জন্যই তিনি খাতুনগঞ্জে এসেছেন বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে চেইন শপ স্বপ্ন, মীনা বাজার। দুটিতেই গিয়ে দেখা যায়, লেখা রয়েছে ‘স্টক সীমিত। সকল গ্রাহকের সয়াবিন তেল কেনার অধিকার নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে প্রতি গ্রাহক সর্বোচ্চ ১ বোতল তেল কিনতে পারবেন।’ তবে খুচরা দাম বেশি রাখা হচ্ছে না এসব শপে।
জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক হয়েছে ৯ মার্চ। বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকরাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ওই বৈঠকে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ও দাম পরিস্থিতি নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরে। এতে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ঘাটতির কথা উল্লেখ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে বলে তারা সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না।
বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে সাতটি পরিশোধন কারখানা ভোজ্যতেল ব্যবসায়ে জড়িত। এগুলো হচ্ছে মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, সিটি এডিবল অয়েল, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস, স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস ও মীর বনস্পতি প্রোডাক্টস। বৈঠকে জানানো হয়, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের মজুদ রয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন। সাতটির মধ্যে চার কারখানার ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫০০ টন এবং চার কারখানার ভোজ্যতেল পাইপলাইনে রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৫৩ টন। কারখানাগুলো প্রতিদিন ৯ হাজার ৮৮ টন করে ভোজ্যতেল বাজারে ছাড়ছে এবং ৯ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে সরবরাহ করেছে ৫৭ হাজার ৬৪৪ টন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে শর্ষে ও রাইস ব্র্যান মিলে ভোজ্যতেল উৎপাদন হয় চার লাখ টন।