Home Lead দেশের পয়ত্রিশ জেলায় নিপাহ ভাইরাস

দেশের পয়ত্রিশ জেলায় নিপাহ ভাইরাস

17


ঢাকা অফিস।।

দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং এর বিস্তার ও ধরন উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তিত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত বছর (২০২৫) রেকর্ড করা চারটি কেসের সবাই মারা গেছেন। এর মধ্যে একটি ‘অ-মৌসুমি কেস’ ধরা পড়েছে, যা দেশে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং সবার মৃত্যু ঘটেছে।

আইইডিসিআরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা গতকাল বুধবার দুপুরে সংস্থার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ সভায় এ তথ্য উপস্থাপন করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন।

২০২৫ সালের সংক্রমণ : নতুন সংকেত

উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী জেলায় চারজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন এবং সবাই মারা যান। বিশেষ করে নওগাঁর ৮ বছরের এক শিশুর সংক্রমণ শীতকাল ছাড়াই আগস্ট মাসে শনাক্ত হয়, যা দেশের প্রথম অ-মৌসুমি নিপাহ কেস। এই শিশুর সংক্রমণের উৎস ছিল বাদুড়ের আংশিক খাওয়া ফল-কালোজাম, খেজুর ও আম। এটি নিপাহ ভাইরাসের নতুন ও এলার্মিং সংক্রমণ পথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

আইইডিসিআর জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৫ সালে শনাক্ত চারজন রোগীর সবাই মারা গেছেন (মৃত্যুর হার ১০০%), যেখানে গ্লোবালি নিপাহ সংক্রমণের গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২%।

সংক্রমণ ও প্রতিরোধ

প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, ঐতিহাসিকভাবে খেজুরের কাঁচা রসকে প্রধান সংক্রমণ উৎস হিসেবে ধরা হলেও, ২০২৫ সালের নওগাঁর কেস প্রমাণ করে, বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত যে কোনো আধা-খাওয়া ফল সরাসরি খাওয়ার

মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এটি এখন সারা বছরই সম্ভব।

মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণও ঘটে। প্রায় ২৮% ক্ষেত্রে নিপাহ আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমণ ছড়ায়, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘২০২৫ সালের অ-মৌসুমি কেস এবং নতুন সংক্রমণ পথ আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। নিপাহ এখন শুধু শীত বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সারা বছরের এবং বহুমুখী সংক্রমণের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

নিপাহ ভাইরাস জরিপ সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরামর্শ

হার্ট ফাউন্ডেশনের এপিডেমিওলজি ও গবেষণা বিভাগের প্রধান ড. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘নিপাহ ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। খেজুরের কাঁচা রস বা বাদুড় কামড় থাকা ফল কখনোই খাওয়া যাবে না। এটি শুধু রোগীর নয়, পরিবারের সব সদস্যের জন্যও বিপজ্জনক।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করেছেনÑ ফাটা, কাটা বা আংশিক খাওয়া ফল না খাওয়া। যে কোনো ফল ভালোভাবে ধুইয়ে খাওয়া। খেজুরের কাঁচা রস পরিহার করা। যদি কেউ আক্রান্ত হয়, এখনও নিপাহ ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ কমানোকে কেন্দ্র করে করা হয়।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যদি কারও জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া দেখা যায় এবং কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার ইতিহাস থাকে, তবে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সন্দেহ করা যায়।’