Home Lead হাত ইশারায় ‘ট্রাফিক সিগন্যাল’ নগরীর সড়কে পদে পদে ভোগান্তি

হাত ইশারায় ‘ট্রাফিক সিগন্যাল’ নগরীর সড়কে পদে পদে ভোগান্তি

26


আবু হেনা মোস্তফা জামাল।।
খুলনা নগরে দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে ট্র্যাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। ফলে নগরের সড়কগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনা ও পথচারীর ঝুঁকি। প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জীবনযাত্রায় এ অব্যবস্থাপনা এখন বড় ধরণের ভোগান্তি তৈরি করেছে। যান নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় ট্র্যাফিক পুলিশেকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে হাতের ইশারা আর বাঁশির ওপর।


১৯৮৭ সালে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নগরের ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্র্যাফিক বাতি স্থাপন করেছিল। লক্ষ্য ছিল নগরের ব্যস্ততম সড়কে শৃঙ্খলাপূর্ণ যান চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রায় দুই দশক ধরে একে একে সব বাতি অচল হয়ে গেছে। বর্তমানে শহরে কার্যকর কোনো সিগন্যাল বাতি নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোথাও বাতি ঝুলছে অকেজো অবস্থায়, আবার কোথাও খুঁটি আছে বাতি নেই। তবে অধিকাংশ স্থানের বাতির মালামাল চুরি হয়ে গেছে , বোঝার উপায় নেই এখানে কোন এস সময়ে সড়ক বাতি ছিল।


নগরবাসী বলছে এই শহরে যানবাহনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে । যা প্রতিফলিত হয়েছে সিটি কর্পোরেশন ও বিআরটিএর তথ্যও। তথ্য বলছে ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নগরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার, ইজিবাইক আর রিকশার চাপে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তৈরি হচ্ছে স্থায়ী যানজট। বিশেষ করে শিববাড়ি, সোনাডাঙ্গা, নিউমার্কেট, গল্লামারী ও খালিশপুর অঞ্চলের সড়কগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠেছে।


যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার হারও উদ্বেগজনক। “একটি উন্নয়নশীল শহরের সিবিডি এলাকায় যানজটের পরিস্থিতির মূল্যায়ন: বাংলাদেশের খুলনা শহরের প্রেক্ষাপট” ও ”খুলনা শহরের সড়ক দুর্ঘটনা পরিস্থিতি” শীর্ষক গবেষণা,তথ্য বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে খুলনা শহরে ২৬৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন পথচারী। সমীক্ষায় দেখা যায়, দুই বছরে ১৫৭টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।


ট্র্যাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সিগন্যাল না থাকায় ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। সিগন্যাল ব্যবস্থা অচল থাকা, রাস্তার নকশা সমস্যা ও চালকের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্রতি মাসে গড়ে ৩০-৪০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি ভর্তি হন, যাদের বেশিরভাগই নগরের ভেতরকার দুর্ঘটনায় আক্রান্ত।


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়র নগর পরিকল্পনা বিভাগের পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সিগন্যাল বাতি পুনঃস্থাপন নয়, স্মার্ট ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্ট চালু করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সিসিটিভি মনিটরিং ও কঠোর আইন প্রয়োগ।

পাশাপাশি ফুটপাত সংস্কার, পার্কিং শৃঙ্খলা, ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া নগরে সড়ক নিরাপত্তা ফিরবে না।যানজটের কারণে নগরের ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রতিদিন শত শত লিটার জ্বালানি অপচয় হচ্ছে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত পরিবারের ওপর নেমে আসছে আর্থসামাজিক বিপর্যয়। নগরবাসীর মানসিক চাপও বাড়ছে।


খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, ‘সিগন্যাল বাতি না থাকায় ট্রাফিক বিভাগকে শুধু হাতের ইশারায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এতে যানবাহন চালক ও পথচারী উভয়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তবে শুধু আধুনিক সিগন্যাল বসালে সমাধান হবে না। চালক ও পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে। এজন্য কেএমপি স্কুলে , স্কুলে গিয়ে শিক্ষাথীদের ট্রাফিক আইন ও পথ চলার নিয়ম শেখাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী জীবন নিরাপদ হওয়ার সাথে সাথে তাদের পরিবারও সড়ক ব্যবহারে সচেতন হবে। এভাবেই একদিন একটি সচেতন সমাজ গড়ে উঠবে।’


অপরদিকে খুলনা সিটি কর্পোরেশন ও একইসাথে বিভাগীয় প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. ফিরোজ সরকার জানান, ‘নগরীর যানজট ও ট্রাফিক বিঘ্নের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। কেসিসি-এর তত্ত্বাবধানে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে; ইজি-বাইক-চালকদের লাইসেন্স ও রুট নিয়ন্ত্রণ করার সফটওয়্যার কার্যকর করার পরিকল্পনা আছে।

সিগন্যাল বাতি পুনরুদ্ধার এবং নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব ইতিমধ্যেই তৈরি হচ্ছে, এবং অর্থায়ন সংক্রান্ত দাতা সংস্থার সঙ্গে আলাপ চলছে।’


যানবাহন বৃদ্ধি ও দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বলছে, যান চলাচল ও রাস্তাঘাটের নকশা-অযোগ্যতা, সিগন্যালের অভাব, অপরিকল্পিত পার্কিং, এবং পথচারী ও চালকের নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা একসঙ্গে মিলিয়ে নগর সড়কে বিপদ বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু সিগন্যাল বাতি লাগানো নয়, রাস্তার ডিজাইন পরিবর্তন, পর্যাপ্ত ফুটপাত ও রাস্তা পারাপারের নিরাপদ স্থান তৈরি, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

অতএব, খুলনা নগরের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা পুনরায় চালু, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই খুলনার সড়ককে নিরাপদ করা সম্ভব হবে।