ক্ষমতার দম্ভে ও দাপটে অসহায় ছিলেন কেসিসির কর্মরত থেকে দলীয় কর্মীরা # বেনামে টেন্ডার, ভাগবাটোয়ারা # বিতর্কিতদের আশ্রয়-প্রশয় # ছিলেন ব্যাংক ও সিরামিক কোম্পানির মালিকও
বিশেষ প্রতিনিধি।।
খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)’র সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেকের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। তিনি কী দেশে অবস্থান করছেন, নাকি পাড়ি জমিয়েছেন দূর থেকে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। খুলনার দাপুটে নেতার নীরবতায় অবাক হচ্ছেন নগরবাসী। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার পতনের ৫ মাসেও সন্ধান মেলেনি এই আওয়ামী লীগ নেতার। অথচর ২০০৮ থেকে ২০২৩, সময়ের ব্যবধান মাত্র ১৫ বছর। আর এই ব্যবধানেই বার্ষিক আয় দেড় লাখ টাকা বেড়ে ২৮ লাখ! নিজের হলফনামায় দেওয়া তথ্যই জানান দিচ্ছে আয় বৃদ্ধির নয়া ম্যাজিক। শুধু টাকাই নয়, সম্পদ বেড়ে হয়েছে চারশ’ গুন। খুলনা সিটি করপোরেশন সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেকের এমন সম্পদেও পাহাড় গড়ার পেছনে উঠে আসছে নিত্য-নতুন তথ্য। নামে বেনামে টেন্ডার, উন্নয়ন কাজের ভাগবাটোওয়ারা, দুর্নীতিবাজ রক্ষা, কমিশন বাণিজ্যেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ‘তালুকদার খালেক-হাবিবুন্নাহার’ স্বামী-স্ত্রীর ফুলমন্ত্রী’।
শুধু অর্থবিত্তই নয়, তাঁর ক্ষমতার দম্ভ ও দাপটে অসহায় ছিলেন খুলনার নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে নিজ দলের কর্র্মীরা। তাঁর দুর্ব্যবহার ও বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে গালাগালে সহসা কেউ তার পথ মারাতেন না। দাপুটে এই নেতাকে নিয়ে দৈনিক খুলনাঞ্চলের অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে ভয়াবহ নানা চিত্র। বিভিন্ন সময়ে নাম লিখিয়েছে ব্যাংকের মালিকানায়। আবার কখনো ছিলেন সিরামিক ইন্ডাট্রিজেও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় তালুকদার আবদুল খালেকের বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তার কাছে নগদ টাকা ছিল মাত্র ৫৭ হাজার ৫৫০। সম্পদ বলতে ছিল ব্যাংকে জমা ১৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে ২৮ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর নামে দশমিক ০৪৯৫ শতক, মূল্য ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। একই ব্যক্তির ২০২৩ সালের হলফনামা দেখা গেছে, তালুকদার আব্দুল খালেকের আয় ওই সময় এসে দাঁড়ায় ২৮ লাখ ১৫ হাজার ৭০২ টাকা। তার কাছে নগদ টাকা আছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ। চারটি ব্যাংকে তার জমা রয়েছে ১ কোটি ১৮ হাজার টাকা। এর বাইরে ৩.২১ একর কৃষি জমি, ৩ কাঠা অকৃষি জমি, রাজউকের পূর্বাচলে একটি, কেডিএর ময়ূরী আবাসিকে একটি, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মুজগুন্নী আবাসিকে প্লট রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তালুকদার আব্দুল খালেক খুলনা পৌরসভার মহসিনাবাদ ইউনিয়নের দুইবার কাউন্সিলর হয়ে জনপ্রতিনিধির খাতায় নাম লেখান। এরপর ছিলেন বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনের চার চার বারের সংসদ সদস্য ও কেসিসির তিনবার মেয়র। একবার মেয়র পদে পরাজিত হয়ে খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালের ১৫ মে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে বাগেরহাট-৩ আসন ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে তার স্ত্রী হাবিবুন্নাহার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর তাকে বন ও পরিবেশ উপ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তালুকদার আব্দুল খালেক কেসিসির মেয়র থাকাকালীন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করতেন। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে বিএনপি-জামায়াত। তখন নগরীর ইউনাইটেড ক্লাবে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মাহমুদ স্বপন এ দম্পতিকে ‘স্বামী-স্ত্রী মিলে ফুলমন্ত্রী’ আখ্যা দেন। স্বপন শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে দলীয় নেতাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদের মাঠে থাকার আহবান জানান। বিশেষ করে তালুকদার আব্দুল খালেককে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন ‘ আপনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তিন ভাগ আর আপনার স্ত্রী হাবিবুননাহার উপমন্ত্রীর পদমর্যাদায় একভাগ। এই নিয়ে আপনার চারভাগ। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী মিলে আপনি ফুলমন্ত্রী’। ওর পর থেকেই খুলনার মানুষের মুখে মুখে ছিল ‘তালুকদার খালেক-হাবিবুন্নাহার’ স্বামী-স্ত্রী মিলে ফুলমন্ত্রী। তালুকদার আব্দুল খালেক খুলনার রাজনীতির মাঠের একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনীতির পথচলা শুরু। সময়ের ব্যবধানে রাজনীতির মাঠ থেকে তার সহযোদ্ধারা একে একে ছিটকে পড়লেও সৌভাগ্য ধরা দিয়েছে তার কাছে। কিন্তু গত ৫ আগস্ট ছাত্র-গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনে তার ভাগ্যে ছন্দ পতন ঘটিয়েছে।
স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯ (সিটি করপোরেশন) এর ধারা ৯ (২) অনুযায়ী, ‘কোনও ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হওয়ার অথবা মেয়র বা কাউন্সিলর পদে থাকবার যোগ্য হবেন না যদি তিনি বা তার পরিবারের কোনও সদস্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের কাজ সম্পাদন বা মালামাল সরবরাহের জন্য ঠিকাদার হন। অথবা তারা এ ধরনের কাজে নিযুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হন বা সিটি করপোরেশনের কোনও বিষয়ে তাদের কোনও ধরনের আর্থিক স্বার্থ থাকে। অথবা তিনি বা তারা সরকার নিযুক্ত অত্যাবশ্যক কোনও দ্রব্যের ডিলার হন।’ সদ্য সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক কাগজে-কমলে এ নিয়মের ব্যতয় করেনি। তবে বাস্তবে ঘটনা ছিল ‘খায়-দায় জব্বার-মোটা হয় আকবর’ অবস্থা। নানা আইন,বিধিমালার জালে পছন্দের ঠিকাদারদেও কাজ দিয়ে কোটি কোটি পকেটস্থ করেছেন। চালু করেছিলেন এক শতাংশ কমিশন পদ্ধতিও। প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেন ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১% জমা নিয়েই শুধু চেক পাশ করতেন। এটা চালু ছিল বছর দুয়েক। আর তাতেই কোটি কোটি টাকা যায় সাবেক মেয়রের। এ কারণেই খুলনা সিটি করপোরেশনে কাজের জন্য ছিল হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কেউ কেউ ৩০-৩৫টি কাজ করলেও অন্য ঠিকাদারদের ভাগ্যের ছিঁকে ছেঁড়েনি। ফলে সিটি করপোরেশনে বঞ্চিত ঠিকাদারা ছিলেন অসহায়।
তথ্য বলেছে, গত কয়েক বছরে সাঈদ এন্টারপ্রাইজের আবু সাঈদ ৩৫-৪০ টি, হোসেন ট্রেডাসের্র সেলিম মুন্সী ১৫-১৬টি, তাজুল এন্টারপ্রাইজের তাজুল ইসলাম ১৫-১৬ আজাদ ইঞ্জিনিয়ারর্স ১৫-১৬টি, টুটুল এন্ড কোং ৭-৮টি, জয়েন্ট ভেঞ্জারে রোজা এন্টারপ্রাইজ, রহমান এণ্ড ব্রাদার্স ৭-১০টি কাজ করেছে। গত কয়েক বছরে মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স, আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্স ও মেসার্স তাজুল ইসলাম নামের ৩টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকার। এসব কাজের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন ঠিকাদার এইচ এম সেলিম ওরফে সেলিম হুজুর।
এর বাইরে বিদায়ী মেয়র ৫ শতাংশ কমিশনের ভিত্তিতে আরও প্রায় শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বড় ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করছেন। মূলত : ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর চিরচেনা তালুকদার আব্দুল খালেক পাল্টে যান। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র (ওটিএম) আহ্বানের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, কাজের সংখ্যাসহ বিভিন্ন শর্তযুক্ত করেন। এতে তাঁর পছন্দের হোসেন ট্রেডার্সের নামে কাজ বরাদ্দ হয়। মূলত: এ প্রতিষ্ঠানটি তার বলে সর্বমহলে আলোচনায় ছিল।
গত ৩০ আগস্ট কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান খুলনা মহানগরীর বিআইডিসি রোডের দ্বিতীয় অংশ (পুরাতন পাওয়ার হাউজ থেকে নতুন রাস্তা মোড় পর্যন্ত) উন্নয়ন কাজের কার্যাদেশ বাতিল করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। কাজটির ঠিকাদার মেসার্স হোসেন ট্রেডার্সকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেন।
নাম প্রকাশ না করে কেসিসির তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের কয়েকজন জানান, সিটি করপোরেশনে টেন্ডারে কি ঘটছে, ওপর থেকে কেউই বুঝতো না। কাগজে-কলমেও সব পরিস্কার। আর দিন দিন ক্ষতির শিকার হয়েছেন ঠিকাদাররা। এসব ঘটনার তদন্ত চান বঞ্চিতরা।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মহানগর সভাপতি হওয়ায় তাঁর অপছন্দের দলীয় নেতাকর্মীরা প্রায়শই দুর্ব্যবহার, লাঞ্ছণা ও অশ্লীল গালাগালের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৩ সিটি নির্বাচনেও সদ্য দলে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেন। এতে বাদ পড়েন অনেক ত্যাগী ও তৃণমূলের নেতারা।
সমর্থন বঞ্চিত এমন তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে খুলনাঞ্চল। নাম প্রকাশ করার শর্তে তারা জানান, দলের দুর্দিনে কাজ করেও তারা শীর্ষ নেতাদের নজরে আসতে পারেননি। সিটি নির্বাচনে হারাতে তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে। আবার এখনও ওইসব ব্যক্তিদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। প্রতিবাদ করার কেউ নেই। অথচ এক সময় কথিত নেতাকর্র্র্র্মীদের ভিড়ে তাদের দলের কার্যালয়েও ঢুকতে বেগ পেতে হতো। সেই কথিতরা কোথায়?
ক্ষমতার প্রভাবে বিতর্কিতদের আশ্রয় বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক। তিনি সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেনের লুটপাটের পেছনের বড় ভূমিকা রাখেন। এ কারণেই খালেককে বানানো হয় ওই ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান। তবে ব্যাংকে লুটপাট ও বিতর্ক তৈরি হলে খালেক পদত্যাগ করেন। শুধু তাই নয়, আমজাদ হোসেনের মালিকানাধীন মুনস্টার পলিমার এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন তালুকদার খালেক। এক সময়ে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল ও ৫ কোটি টাকা অর্থদন্ড হয়। তখন পদত্যাগ করে সেখান থেকে সরে পড়েন তালুকদার আব্দুল খালেক। আর এ ঘটনার সংবাদ প্রকাশ করে সাবেক মেয়রের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় জেল খাটেন এনটিভির খুলনা প্রতিনিধি আবু তৈয়ব।
তালুকদার আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। তিনি নিজ ক্ষমতায় কাউন্সিলর না থাকা সত্ত্বেও খুলনা ওয়াসায় পারভীন আক্তারকে প্রতিনিধি করে রেখেছেন। কাউন্সিলরদের বরাদ্দের ক্ষেত্রে করা হতো বৈষম্য। কেসিসির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার ছেড়ে দেওয়া বাগেরহাট-৩ আসনে স্ত্রী হাবিবুন নাহারকে এমপি বানান। ফলে রামপাল-মোংলায়ও দলের মধ্যে রয়েছে তাঁর শক্ত প্রতিপক্ষ।
সর্বশেষ নির্বাচনে মো. ইদ্রিস আলী এই দম্পতির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিলেও জিততে পারেনি। ওই নির্বাচনে এই দম্পতির বিরুদ্ধে ব্যাপক টাকা, সন্ত্রাসী ও প্রশাসনকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লস্কর তাজুল ইসলাম খুলনাঞ্চলকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে কাজ পাওয়া শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। কিছু কাজের পুন:দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।











































