Home জাতীয় বালিশকাণ্ডের পর একই ঠিকাদারের বিমকাণ্ড

বালিশকাণ্ডের পর একই ঠিকাদারের বিমকাণ্ড

46
মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন

 

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নির্মাণাধীন হলের ছাদের বিম ধসে পড়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বালিশকাণ্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানটি রাবির বড় দুই ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করছে। তবে এই প্রকল্পের কাজে একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্বভাবত প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিম ধসে পড়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাবি কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে সাত দিনের প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

জানা গেছে, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের বড় দুটি প্রকল্পের একটি হলো ছাত্রদের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হল নির্মাণ। হলটি নির্মাণের চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ পর্যন্ত হল নির্মাণের অগ্রগতি ৭৫ ভাগ। কিন্তু মঙ্গলবার হলের অডিটোরিয়ামের ছাদ ঢালাইয়ের সময় বিম ধসে পড়ে। এতে ৬ জন নির্মাণশ্রমিক আহত হন।

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার শাহরিয়ার হাসান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বিম ঢালাইয়ের ২৮ দিন পর ছাদ ঢালাই দেওয়ার কথা। কিন্তু বিম ঢালাইয়ের মাত্র ৯ ঘণ্টা পর ছাদ ঢালাই দিচ্ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নিয়ম না মেনে ঢালাই ও দুর্বল সাটারিংয়ের কারণে ধসে পড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

গোটা কাজটি নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার। তিনি বলেন, আমি এক্সপার্টদের ডেকে আনব। যেটা করার করা হবে। এটির সঙ্গে আমাদের অর্থ ও শিক্ষার্থীদের জীবন জড়িত।

অপরদিকে বিশ^বিদ্যালয়ের একই প্রকল্পের আওতায় ২০ তলাবিশিষ্ট বিজ্ঞান ভবন নির্মাণের কাজও করছে মজিদ সন্স। ভবনটি নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ১৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। নির্মাণকাজের অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ।

২০২২ সালের ৩১ মে নির্মাণাধীন অ্যাকাডেমিক ভবনের কাজের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নির্মাণ শ্রমিক সাগরের মৃত্যু হয়। একই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি নির্মাণাধীন অ্যাকাডেমিক ভবনের পাশে নির্মাণকাজের মালামাল বহনকারী ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন শিক্ষার্থী মাহমুদ হাবিব হিমেল। এর আগে ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে নির্মাণ শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মজিদ সন্সকে নির্দেশও দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তা আমলে নেয়নি।

এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মহানগরীর রাজিব চত্ব¡র এলাকায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভার ব্রিজ নির্মাণ, শালবাগানে ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে কিচেন মার্কেট ও ভদ্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মার্কেট নির্মাণের কাজ করছে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন। তাদের ওয়বসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রুয়েটে ১০ তলাবিশিষ্ট যন্ত্রকৌশল অনুষদ ভবন নির্মাণ ও ৬৪ দশমিক ৪ কোটি ব্যয়ে ইনস্টিটিউট ভবন নির্মাণের কাজ করছে। এ ছাড়া ৪৪ দশমিক ৫৪৫ কোটি ব্যয়ে রাজশাহী ওয়াসা ভবন নির্মাণের কাজও করছে তারা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর ইসলাম তুষার বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্সের কাজে ত্রুটি বা গাফিলতি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমরা নিয়ম অনুযায়ীই কাজ বুঝে নিতে চাই। এ জন্য ইঞ্জিনিয়ারদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন ও রুয়েটের প্রকৌশল শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজশাহীতে অনেকটা হঠাৎ করে নির্মাণ খাতে মজিদ সন্সের উত্থানের পেছনে উচ্চপর্যায়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। ঢাকা ও রাজশাহীর প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে বড় বড় কাজ পেয়েছে তারা। ফলে রাজশাহীতেও এখন তাদের কার্যক্রমে বিস্তার ঘটিয়েছে মজিদ সন্স।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্যের জন্য মজিদ সন্স কনস্ট্রাশন প্রাইভেট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক জার্জিসুর রহমান ও প্রজেক্ট ম্যানেজার তৌফিক আজিজের মোবাইল ফোনে একাধিকার কল করা হলে তারা ফোন রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তারা সাড়া দেননি।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে রাবির ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ৩৬৩ কোটি টাকা পাস হয়। এই প্রকল্পের আওতায় শেখ হাসিনা হল, এএইচএম কামারুজ্জামান হল, ১০ তলা ভবনবিশিষ্ট শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন, ড্রেন নির্মাণ, শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা হয়।