শামিম শিকদার।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১১ দিন। এই সময়ে যেখানে প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি ভোটার সংযোগ নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে খুলনা মহানগরীর দুই গুরুত্বপূর্ণ আসন খুলনা-২ ও খুলনা-৩–এ বিএনপির নির্বাচনী কার্যক্রম নিয়ে উঠে আসছে উদ্বেগজনক তথ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারণা থাকলেও তা কার্যত ভোটারবিমুখ, বহরমুখী ও আত্মপ্রচারনির্ভর হয়ে পড়েছে।
শোডাউন আছে, ভোটার নেই: গত এক সপ্তাহ ধরে খুলনা-২ ও ৩ আসনের একাধিক এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই বড় মিছিল, ও শোভাযাত্রা বের হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে শত শত নেতাকর্মীর উপস্থিতি থাকলেও ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেই। এমনকি অনেক এলাকায় ভোটার তালিকা ধরে পরিকল্পিত প্রচারণার কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি। স্থানীয় একাধিক ভোটারের ভাষ্য, নির্বাচনী প্রচারণা মূলত রাস্তা ও মোড়ে সীমাবদ্ধ। বাড়ির ভেতরে ঢুকে কথা বলা, ভোটারদের সমস্যা শোনা কিংবা তরুণ ভোটারদের ভোটপ্রক্রিয়া বোঝানোর উদ্যোগ নেই বললেই চলে।
সমর্থকরাও উপেক্ষিত: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিএনপির দীর্ঘদিনের সমর্থকরাও মাঠের কর্মীদের অবহেলায় ক্ষুব্ধ। খুলনা-২ আসনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মরিয়াম বেগম বলেন, আমরা ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি। এবার সুযোগ এসেছে, অথচ এখনো আমাদের দরজায় কোনো কর্মী আসেনি। আমরা বিএনপির ভোটার—এটা জানার পরও কেউ খোঁজ নেয়নি। তিনি জানান, তার পরিবারের চারজন তরুণ ভোটার ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কেও অনিশ্চিত। কেউ বোঝাতে আসেনি। শুধু মিছিল করলে ভোট পাওয়া যায় না-ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এমন অভিযোগ একই ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ নয়। নগরীর একাধিক এলাকায় একই ধরনের হতাশা ও অভিমান প্রকাশ করেছেন ভোটাররা।
নেতৃত্ব বনাম মাঠের বাস্তবতা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা একাধিক বৈঠকে ঘরে ঘরে ভোটার সংযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হয়নি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ অভিযোগ করছেন, প্রচারণা কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল নেতা বলেন, কিছু নেতা শুধু প্রার্থীর পাশে থাকতেই ব্যস্ত। কে কত ছবি তুললো, কে লাইভ করলো-এই প্রতিযোগিতা চলছে। ভোটার তালিকা ধরে কাজ করার মতো কেউ নেই।
তরুণ ও নারী ভোটার উপেক্ষিত: অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই। কোথাও ভোট প্রশিক্ষণ, কোথাও সচেতনতামূলক আলোচনা বা ঘরোয়া সভার নজির পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত তরুণ ভোটাররা এখনো দ্বিধায় রয়েছে। তাদের কাছে পৌঁছাতে না পারলে নির্বাচনের দিনে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে পারে।
জামায়াতের ভিন্ন কৌশল: এদিকে মাঠে ভিন্ন কৌশলে কাজ করছে জামায়াত-এমন তথ্যও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। বড় শোডাউনের বদলে তারা সংগঠিতভাবে ভোটারদের বাড়িতে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নারী কর্মীরা সকাল থেকে ভোটার সংযোগে সক্রিয়। ফজরের নামাজের পর থেকেই তাদের প্রচারণা শুরু হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার সংযোগের এই পার্থক্য শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ঝুঁকির মুখে সম্ভাবনা: বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির প্রতি জনসমর্থন থাকলেও মাঠপর্যায়ের এই সাংগঠনিক দুর্বলতা বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে সম্ভাব্য বিজয়। ইতিহাস বলছে, ভোটার উপেক্ষিত হলে শেষ সিদ্ধান্ত ব্যালট বাক্সেই প্রতিফলিত হয়-তা অনেক সময় নেতিবাচকভাবেই।
শেষ মুহূর্তের সতর্কতা: ভোটারদের ভাষ্য স্পষ্ট- ভোট চাইলে আগে ভোটারের দরজায় যেতে হবে। শুধু স্লোগান, মিছিল আর বহর দিয়ে ভোট নিশ্চিত হয় না। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে?











































