ডা. অবন্তি ঘোষ।।
মাতৃত্ব নারীজীবনে এক গভীর কামনা ও আবেগের বিষয়। কিন্তু যখন সেই প্রত্যাশাপথে বারবার গর্ভপাতের মতো বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, তখন তা শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভীষণ পীড়া দেয়। অনেক নারীই বুঝে উঠতে পারেন না, কেন বারবার এমনটি ঘটছে এবং এর সমাধান আদৌ সম্ভব কিনা। সাধারণত চব্বিশ সপ্তাহের আগে যদি দুবার বা তার বেশি গর্ভপাত ঘটে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে পুনঃপুন গর্ভপাত। এ ধরনের গর্ভপাতের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বাকি অর্ধেক ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ শনাক্ত করা সম্ভব।
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে সন্তান নষ্ট হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে জিনগত ত্রুটি অন্যতম। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, অ্যান্টি-ফসফোলিপিড অ্যান্টিবডি সিনড্রোম, যেখানে গর্ভফুলের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এ ছাড়া হরমোনজনিত সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখে। যেমন- পলিসিস্টিক ওভারি রোগ, ডায়াবেটিস এবং থাইরয়েড হরমোনের অসামঞ্জস্য।
গর্ভাবস্থার তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে গর্ভপাত হলে সাধারণত জরায়ুর গঠনগত সমস্যার কথা ভাবতে হয়। জন্মগতভাবে জরায়ু দুভাগে বিভক্ত থাকা, যেমন- সেপটেট জরায়ু বা বাইকর্নুয়েট জরায়ু এ ক্ষেত্রে দায়ী হতে পারে। জরায়ুমুখ দুর্বল থাকলে সময়ের আগেই তা খুলে যেতে পারে। ফলে গর্ভপাত ঘটে। এ সময়ও অ্যান্টি-ফসফোলিপিড অ্যান্টিবডি সিনড্রোম, বিভিন্ন হরমোনজনিত সমস্যা এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা গর্ভপাতের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া মায়ের বয়স ৩৫ বছরের বেশি, বাবার বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়া, ধূমপান এবং পরিবেশগত বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শেও ঝুঁকি বাড়ে।
বারবার গর্ভপাতের কারণ নির্ণয়ে কিছু পরীক্ষা প্রয়োজন। মাসিক অনিয়মিত হলে হরমোন পরীক্ষা করা হয়। ডায়াবেটিস নির্ণয়ে খালি পেটে এবং গ্লুকোজ খাওয়ার দুঘণ্টা পরে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। অ্যান্টি-ফসফোলিপিড অ্যান্টিবডি আছে কি-না, তাও পরীক্ষা করা জরুরি। জিনগত ত্রুটি শনাক্ত করতে ক্যারিওটাইপিং করা হয়। গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে জরায়ুর মুখের দৈর্ঘ্য মাপা হয়। যদি তা ২.৫ সেন্টিমিটারের কম হয়, তাহলে জরায়ুর মুখের দুর্বলতা ধরা হয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমেই রোগীকে সঠিকভাবে বোঝানো ও মানসিক সমর্থন দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। গর্ভধারণের অন্তত তিন মাস আগে ফলিক অ্যাসিড এবং অল্প মাত্রার রক্ত তরলকারী ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। গর্ভধারণের পর প্রজেস্টেরন হরমোন দেওয়া হতে পারে। গর্ভপাতের সঠিক কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। জরায়ুর জন্মগত ত্রুটি থাকলে প্রয়োজনে তা সংশোধন করা হয়। জরায়ুমুখ দুর্বল হলে সেখানে সেলাই দেওয়া হয়। থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস ও পলিসিস্টিক ওভারি রোগের যথাযথ চিকিৎসা করা হয়। অ্যান্টি-ফসফোলিপিড অ্যান্টিবডি সিনড্রোম থাকলে গর্ভাবস্থায় রক্ত তরলকারী ওষুধ, যেমন- অ্যাসপিরিন ও হেপারিন দেওয়া হয়। জিনগত সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রজনন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভ্রƒণ তৈরি করে জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
যথাযথ চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং স্নেহপূর্ণ মানসিক সহায়তার মাধ্যমে দুই থেকে তিনবার গর্ভপাতের পরও প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফল গর্ভধারণ সম্ভব এবং সুস্থ শিশুর জন্ম দেওয়া যায়।
লেখক : গাইনি, প্রসূতি ও বন্ধ্যত্ব রোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা
হটলাইন : ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯











































