শামিম শিকদার
খুলনা-৪ সংসদীয় আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত দিক থেকে স্পর্শকাতর হিসেবে পরিচিত। খুলনা জেলার দিঘলিয়া, রূপসা ও তেরখাদা উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১০২নং এই আসনটি শিল্পাঞ্চল, শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, গ্রামীণ জনপদ ও নগর-সংলগ্ন এলাকার মিশ্রণে একটি বৈচিত্র্যময় ভোটব্যাংক তৈরি করেছে। ফলে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে এই আসনটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনা-৪ আসন ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। গত ২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই আসনের নির্বাচনী মাঠের প্রাথমিক চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আজমল হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে চারজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বৈধ ঘোষিত প্রার্থীরা হলেন— ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ইউনুস আহম্মেদ সেখ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রার্থী এস কে আজিজুল বারী, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এস এম সাখাওয়াত হোসাইন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোঃ কবিরুল ইসলাম।
মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের পরপরই খুলনা-৪ আসনে মাঠের রাজনীতিতে নতুন গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে সীমিত কর্মসূচি থাকলেও পর্দার আড়ালে চলছে জোরালো রাজনৈতিক তৎপরতা। ভোটার তালিকা ধরে ধরে হিসাব-নিকাশ, কেন্দ্রভিত্তিক শক্তি-দুর্বলতা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য ভোট বিভাজনের অঙ্ক কষছে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলো। কোথাও চলছে তৃণমূলের ক্ষোভ প্রশমন, কোথাও আবার সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বৈঠক। বিশেষ করে ওয়ার্ড ও ইউনিট পর্যায়ে সংগঠনকে চাঙা করতে দলগুলো ওয়ার্ডভিত্তিক সভা, দায়িত্ব বণ্টন এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক টিম গঠনে ব্যস্ত সময় পার করছে। নির্বাচনী মাঠে দৃশ্যমান শান্ত ভাব থাকলেও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতির চাপ ও প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯৩ জন। এই বিপুল ভোটারের ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ১৪৪টি ভোটকেন্দ্র ও ৭১৯টি বুথ। নদীঘেরা এলাকা, শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন জনবসতি এবং বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চল—সব মিলিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুলনা-৪ আসনে ভোটের অঙ্ক কেবল দলীয় জনপ্রিয়তায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রার্থী ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব, তৃণমূল সংগঠনের শক্ত অবস্থান এবং ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বড় ভূমিকা রাখে। শ্রমিক অধ্যুষিত শিল্পাঞ্চল, কৃষিনির্ভর গ্রামাঞ্চল এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির ভোট—সব মিলিয়ে ভোটের সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে জোট রাজনীতি, ভোট ভাগাভাগি এবং শেষ মুহূর্তের কৌশলগত সিদ্ধান্ত বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। মনোনয়ন যাচাইয়ের পর থেকেই পর্দার আড়ালে চলছে জোট সমন্বয়, সমর্থন আদান-প্রদান এবং ‘কে কার ভোট কাটবে’—এই সূক্ষ্ম অঙ্কের হিসাব। প্রকাশ্যে শান্ত পরিবেশ থাকলেও নীরবে চলছে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
সব মিলিয়ে, খুলনা-৪ আসনের নির্বাচন শুধু একটি আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি খুলনা অঞ্চলের সামগ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। সময় যত এগোচ্ছে, ততই খুলনা-৪ আসনের “বিহাইন্ড দ্য সিন” রাজনীতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—যার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা যাবে ভোটের দিন ব্যালট বাক্সে।











































