আবু হেনা মোস্তফা জামাল
বিগত অনেকদিন থেকে ভাবছিলাম বাংলাদেশের ২৪ এর অভ্যুত্থান নিয়ে কিছুটা বিেেশ্লষণ করা প্রয়োজন। ঠিক সেই সময়ে চলমান নেপালের গণঅভ্যুত্থান আবারও এই উপ-মহাদেশের রাজনৈতিক চর্চা ও কাঠামো নিয়ে আমাকে ভাবতে তাগাদা দিয়েছে। এরমধ্যে অনেকটা তড়িঘড়ি করে দেশের দুটি বড় বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়ার বিষয়টাকে পর্যবেক্ষণও করছি। কেন এত দ্রুত এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিবেশে এই নির্বাচন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন করেছি বিজ্ঞ বন্ধুজনের কাছে। অনেক অনেক তাদের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অধিকাংশের ব্যাখ্যার সাথে ফলাফলও মিলেছে। এ ঘটনাটি ছোট করে দেখবার অবকাশ নেই বলে একটু অতীত ঘাটতে বসলাম।
জুলাই ২০২৪। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এর সাথে সরকারের অবিবেচক প্রতিক্রিয়া, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং তার ক্রম নিম্নমুখী জনসমর্থন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। ফলে তরুণ জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ায় রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়।
এই শূন্যতাই শক্তিশালী এবং চরমপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, অভ্যুত্থানের পর দক্ষিণপন্থি এবং উগ্রপন্থি রাজনীতি ধীরে ধীরে প্রবল প্রভাব বিস্তার করছে। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ও হঠাৎ সরকার পতনের পরে সামাজিক শূন্যতা দেখা দেয়। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঙ্ক্ষিত কর্মদক্ষতার ও সাংগঠনিক ব্যর্থতায় ২৪’র আন্দোলনের সামনের সারির তরুণ নেতাদের হতাশাগ্রস্ত করে ফেলেছে। যার বহি:প্রকাশের চূড়ান্ত রূপ জাতি দেখেছে আন্দোলনের একবছর পূর্তিতে। সব মিলয়ে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংকট এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে মাথাচাড়া দিয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদ, সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে জাতীয়তাবাদ। ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনেকটা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষয় বাঙালি সংস্কৃতির উদার, সহনশীল ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এই প্রক্রিয়ায় বাম ও মধ্যবাম রাজনৈতিক শক্তি তাদের প্রভাব হারাচ্ছে দ্রুত। আন্দোলনে এই গোষ্ঠীর তৎপরতা, সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পরিকল্পনায় মেধা প্রয়োগের পরও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলে তারা। ফলে বাম ও মধ্যবাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণও সংকুচিত হচ্ছে। এমন রাজনৈতিক শূন্যতায় দক্ষিণপন্থি শক্তি তাদের জায়গা দখল করছে। তারা শক্ত অবস্থান পেতে যে কোনো সময়ে আরো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভোট ও জনমতের প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রাজনৈতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসা, শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগ কমছে, বাণিজ্য ও রপ্তানি খাতের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকা শক্তি, তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাকরি ও আয় হ্রাসের কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সামাজিক স্থিতিশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণপন্থি রাজনীতির উত্থান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও ফেলেছে। গেল এক বছরে দেশের শিল্পাঙ্গন স্থবির। ট্যাগের রাজনীতির কারণে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সকল কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ। প্রতিক্রিয়াশীলরা বলতে পারেন কে বন্ধ রাখতে বলেছে ? সবকিছু কি বলতে হয় ? মবের যে নজির সৃষ্টি হয়েছে তাতে গায়ে হাত দিয়ে বোঝাতে হয় না। অপরদিকে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির দুর্বলতা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধির ফলে, মুক্তচিন্তা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার উদার দৃষ্টিভঙ্গিও হুমকির মুখে পড়ছে। সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থী ও যুব সমাজ বিভক্ত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
আভ্যন্তিরিন বিশ্লেষণের সাথে সাথে ভৌগোলিক বিষয়েও একটু নজর দেয়া প্রয়োজন। দেশের অস্থিতিশীল অবস্থা আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশগুলো এই অস্থিতিশীলতা কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের নীতি প্রণয়ন সীমিত হয়ে পড়েছে। যদিও অনেক কমিশন হ ও কমিটি হয়েছে। কিন্তু এই সব কমিশনের প্রস্তাব কতটা জণগ্রহণযোগ্য তা প্রশ্ন রাখে।
স্বীকার করি আর নাই করি রাষ্ট্রীয় নীতি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় স্বল্প স্থিতিশীলতা দেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে। আমরাও এর বাইরে নেই। এ অবস্থায় সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’ বজায় রাখতে তারা মাঠে আছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শূন্যতায় তারা বাস্তব নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ পারছে কি? দেশের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিরক্ষাবাহিনী জনগণের কাছে সমাদৃত। কিন্তু গেল এক বছরে তাদের নিয়ে কম কথা হয়নি, তাদের মধ্যকার অর্গান বিলুপ্তিরও দাবি উঠেছে। তাদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, গেল এক বছরে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও কমেছে। ফলে আগামীদিনে সুষ্ঠু নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংস্কার ও অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। নতুন নেতা, যুব শক্তি এবং কিছু বাম ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশ পুনঃসমর্থনের মাধ্যমে দল গোছানোর চেষ্টা করছে। তবে দক্ষিণপন্থি ও উগ্রপন্থি শক্তির প্রভাব পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলবে। অপরদিকে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে শ্রদ্ধার অভাব, কর্মী বঞ্চনা, অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি ও ঊর্ধ্বতন নেতাদের নিজেদের ভুল স্বীকারের সংস্কৃতি না থাকা এবং অতিবিপ্লবী মনোভাব দল পুনর্গঠনে অন্যতম অন্তরায়। রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, যেকোনো দলের পুনর্গঠন তখনই সফল হয়, যখন জনগণ ও বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়। এর ফলে বড় দেশের বড় একটি অংশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছে।
এই অবস্থায় ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা গভীর হতে পারে। তরুণ নেতৃত্বের হতাশা, রাজনৈতিক দমন এবং সামাজিক উত্তেজনা দেশের রাজনৈতিক সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করবে। মধ্যবিত্ত ও বামপন্থী অংশের প্রভাব কমে গেলে, দক্ষিণপন্থি ও উগ্রপন্থি রাজনীতির প্রভাব বৃদ্ধি হতে থাকবে। ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও উদার সংস্কৃতির ওপর হুমকি বাড়বে। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক দমন একত্রিত হয়ে দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করবে। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত, মধ্যপন্থি ও বামপন্থিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা ও বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ সমাজের সামাজিকও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কাম্য।
পরিশেষে বলি তরুণ নেতৃত্ব, নাগরিক সচেতনতা, স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংস্কার কার্যকর হলে গণতান্ত্রিক সংস্কারের সম্ভাবনা ফিরে আসতে পারে। স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংরক্ষণ ছাড়া কোন পরিবর্তনই দীর্ঘস্থায়ী হবে না এই বাংলায়। রাজনৈতিক শূন্যতা দুর করতে রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতার পুন:স্থাপন অপরিহার্য।
লেখক: সংবাদকর্মী।











































