খুলনায় ৫ বছরে অসময়ের তরমুজ চাষ বেড়েছে তিনগুন

40


স্টাফ রিপোর্টার
স্বল্প সময়ে ভালো ফলন ও লাভ থাকায় খুলনার উপকূলীয় কৃষকরা অসময়ের তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। মাত্র ৫ বছরেরর ব্যবধানে এ জেলায় তিনগুন জমিতে আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে। চলতি মৌসুমে খুলনার কৃষকরা ১১০ কোটি টাকার বেশী তরমুজ উৎপাদন করছেন ।
কৃষকরা বলেছেন, বর্ষাকালে অন্যান্য ফসলের তুলনায় তরমুজ চাষ বেশি লাভজনক। স্বল্প জমিতে চাষযোগ্য ও মাঠ পর্যায়ে ভালো দাম পাওয়ায় তারা তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালীন তরমুজ অনেকটাই আশীর্বাদ স্বরুপ। আগস্ট মাসের দিকে মৌসুমী সকল ফলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। আর ঠিক এ সময়ে অমৌসুমী তরমুজের ফলন শুরু হয়। ৩৩ শতকের ১ বিঘা জমিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ ২০-২৫ হাজার টাকা। সাধারনত ৬০-৭০ দিনের মধ্যে ফল তোলা সম্ভব হয়। প্রতিটি ফলের গড় ওজন ৩-৫ কেজি। কৃষক মাঠ পর্যায়ে প্রতিকেজি তরমুজ ৩০-৩৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। এতে প্রতি বিঘা জমি থেকে কৃষক ১ হাজার ২০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারেন। আবার খুলনা জেলার উপকূলীয় এলাকার মাটি ও আবহাওযা তরমুজ চাষ বেশ উপযোগী। এখানকার মাটি ও আবহাওযা তরমুজ চাষের জন্য উপযুক্ত। মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ায় সহজেই মৎস্য ঘের, জমির আইলে স্বল্প জায়গায়যোগ্য হওয়ায় দিন দিন খুলনা অঞ্চলের অমৌসুমী তরমুজ চাষ বাড়ছে। জেলার নয়টি উপজেলায় কমবেশী তরমুজ চাষ হলেও শীর্ষে রয়েছে বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া উপজেলা। চলতি বছরে জেলা তরমুজ চাষ হয়েছে ৯৬৬ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে বটিয়াঘাটায় ৬৫০ হেক্টর, ডুমুরিয়ায় ১৮১ হেক্টর, পাইকগাছায় ৪২ হেক্টর, তেরখাদায় ৩৪ হেক্টর, কয়রায় ৩০ হেক্টর, দাকোপে ১৬ হেক্টর, রূপসায় ৯ হেক্টর, দিঘলিয়ায় ২ হেক্টর ও ফুলতায় ২ হেক্টর জমিতে।
কৃষি দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ উৎপাদন হয় ৮ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৭৪ হেক্টর জমিতে ১০ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪০০ হেক্টর জমিতে ১৩ হাজার ২৮০ মেট্রিক টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯২৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ উৎপাদন হয়েছে ২৯ হাজার ৭২৮ মেট্রিক টন। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৯৬৬ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে, যা থেকে উৎপাদন হবে ৩০ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। এ থেকে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা ১১০ কোটি টাকার মতো তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন।
বটিয়াঘাটার শুকদারা বিল, রাজখার বিল এলাকার প্রতিটি মৎস্যঘের, জমির আইলে অসময়ের (অমৌসুমী) তরমুজের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে এ এলাকার চান্দারডাঙা, গাওঘরা, সুরখালি গ্রামের কৃষকরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
তরমুজ চাষী মো: আরব আলী সরদার, মো: রাজু শেখ, মো: মাহাবুর মোল্যা, মো: আবিদুর রহমান, মো: ওসমান শেখ, মো: সাদ্দাম শেখ অন্যরা জানান, তাদের অধিকাংশ তিন ফসলী, দো-ফসলী জমি চাষ অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। লবণাক্ততা, পানি সংকট আবার জলাবদ্ধতায় ফসল উৎপাদন করা অসম্ভব। অসময়ের তরমুজ চাষে শ্রম ও ব্যয় কম হওয়ায় সহজে চাষযোগ্য। আবার দামও ভালো থাকায় মাছের ঘের, পুকুর পাড় ও জমির আইলে তরমুজ চাষ করছেন। কৃষি অধিদপ্তর তাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ায় ভালো ফল পাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো: নজরুল ইসলাম জানান, পানি প্রবাহ বন্ধ থাকায় খুলনা অঞ্চলের অধিকাংশ নদী-খাল মরে গেছে। এতে করে দু-তিন ফসলী জমিগুলো অনাবাদী ও পতিত হয়ে পড়েছে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অসময়ের তরমুজ চাষের জন্য এ অঞ্চলের মাটি ও পরিবেশ উপযোগী এবং লাভজনক। মাত্র দু’মাসে পতিত ও পরিত্যাক্ত জমিতে তরমুজ চাষ করতে পারছেন। ভোক্তার চাহিদা থাকায় বাজারে তরমুজের দামও ভালো। এজন্য দিন দিন চাষীদের আগ্রহ বাড়ছে। চলতি মৌসুমে ১১০ কোটি টাকার বেশী তরমুজ উৎপাদন হবে আশা করা হচ্ছে।
এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক মূল্যের চেয়ে তরমুজের পুষ্টিগুণ ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। এ সময়ে অন্যকোন ফল না থাকায় এই তরমুজের চাহিদা রয়েছে। কৃষি দপ্তর বিসিআরএল প্রকল্পের আওতায় বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া ও পাইকগাছায় অফসিজনাল তরমুজের উপর ১৬টি কৃষক মাঠ স্কুল করা হয়েছে। আগামী এ সংখ্যা আরো বাড়বে। এছাড়া ক্লাইমেট-স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে খুলনা কৃষি অঞ্চলের জলবায়ূ পরিবর্তন অভিযোজন প্রকল্পের মাধ্যমে অফসিজনাল তরমুজের ১১৪ টি প্রদর্শনী বাস্তবায়িত হচ্ছে। তরমুজ চাষীদের প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ ও তরমুজ চাষের উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদার কারণে আমরা তরমুজ চাষ আরো বাড়াতে চাই। এ জন্য নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ ও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।