Home আলোচিত সংবাদ সাংবাদিকদের সুরক্ষায় হচ্ছে নতুন আইন

সাংবাদিকদের সুরক্ষায় হচ্ছে নতুন আইন

45


ঢাকা অফিস।।

বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। মাঠপর্যায়ে খবর সংগ্রহের সময় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম উন্মোচনের কারণে সাংবাদিকরা প্রায়ই হামলা, অবরোধ, মামলা কিংবা ভয়ভীতির মুখোমুখি হন। দীর্ঘকালের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও চাপ বিবেচনায় নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্প্রতি চূড়ান্ত করেছে ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া।

খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হুমকি বা হয়রানি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দোষী ব্যক্তির ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- অথবা ন্যূনতম এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দ- হতে পারে। আদালত চাইলে জরিমানার অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগী

সাংবাদিককে প্রদানেরও নির্দেশ দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের দাবিতে আমরা বহুদিন আন্দোলন করেছি। সরকার যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন করেছে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি।’

তবে তিনি মনে করেন, শুধু সহিংসতা প্রতিরোধের বিধানই যথেষ্ট নয়। সাংবাদিকদের চাকরির স্থায়িত্ব ও বেতনের নিরাপত্তা বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত ছিল। বাস্তবে অনেক সাংবাদিক হঠাৎ করেই চাকরি হারান এবং মফস্বল সাংবাদিকরা ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না। সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ সরকারের বিজ্ঞাপন বিল ওয়েজবোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী নিলেও কর্মরত সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সেটি কার্যকর করে না। তার মতে, আইনকে সর্বগ্রাহী ও কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আরও বিস্তৃত মতবিনিময় অপরিহার্য।

জানা গেছে, সংবিধানের ৩২, ৩৯ ও ৪০ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। খসড়া অধ্যাদেশে সাংবাদিকদের সুরক্ষা এই সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গেই সংযুক্ত করা হয়েছে।

অধ্যাদেশের ৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের সহিংসতা ও হয়রানি থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে। জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ বা প্রচারের কারণে সাংবাদিকরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সরকারের ওপর বর্তাবে।

ব্যক্তি স্বাধীনতা ও তথ্যসূত্রের নিরাপত্তা : খসড়ায় সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। কোনো সাংবাদিকের বাসায় বেআইনিভাবে প্রবেশ, তল্লাশি বা সম্পদ জব্দ করা যাবে না। তাকে ভয়ভীতি বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করে তথ্যসূত্র প্রকাশে বাধ্য করা যাবে না। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ উদ্যোগ নিতেও কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে।

সরল বিশ্বাসে প্রকাশে দায়মুক্তি : সাংবাদিকরা সরল বিশ্বাসে জনস্বার্থে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তার ফলে কারও ক্ষতি হলেও ভিন্ন উদ্দেশ্যের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। এটি সাংবাদিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অভিযোগ দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়া : সহিংসতার শিকার সাংবাদিকরা সরাসরি, অনলাইনে বা প্রতিনিধি মারফত প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করতে পারবেন। আদালত এর পর পুলিশ সুপারকে তদন্তের নির্দেশ দেবেন এবং ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক হবে। বিচার হবে জুডিশিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণে আদালতের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না।

সহিংসতার সংজ্ঞা ও মিথ্যা অভিযোগের দায় : অধ্যাদেশে সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানির স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, ভয়ভীতি, অপমান, নজরদারি, যৌন হয়রানি, অপহরণ, অবৈধ আটক, বলপ্রয়োগ কিংবা কাজে বাধা দেওয়া। তবে সাংবাদিকরা যাতে আইনের অপব্যবহার না করেন সে বিষয়েও সতর্কতা রাখা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করলে সাংবাদিকের এক বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

কোম্পানির দায় : যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকের ওপর সহিংসতা চালায়, তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা বিনিয়োগকারীরা অভিযুক্ত হবেন- যদি না তারা প্রমাণ করতে পারেন যে ঘটনাটি তাদের অজ্ঞাতে ঘটেছে বা রোধে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন।