আবু হেনা মোস্তফা জামাল:
উড়োজাহাজের দুর্ঘটনা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ছিন্নভিন্ন প্লেনের ধ্বংসস্তূপ, আর্তনাদ, নিহত ও নিখোঁজের তালিকা। কিন্তু প্রতিবারই কি তা নিছক দুর্ঘটনা? নাকি এর পেছনে থাকে গাফিলতি, অবহেলা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, কিংবা আরও ভয়াবহ কিছু ষড়যন্ত্র, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতা বা সন্ত্রাসী হামলা?
এই প্রশ্ন গুলি মাথায় ঘুরপাক খায় । কিন্তু কোন এ অজানা ভয়ে প্রশ্ন গুলি আর করা হয় না। কেবল আমি নই এমন প্রশ্ন বাংলাদেশে কোন রিপোর্ট আমি দেখেছি মান হয় না । একজন সাংবাদিক হিসেব বলছি সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু তথ্য জানানো নয়, বরং সত্য অনুসন্ধান করে জনস্বার্থে
তা উপস্থাপন করা। অথচ বাংলাদেশে যখন কোনো বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, তখন তাৎক্ষণিক সংবাদগুলোর শিরোনাম হয়: “বিমান দুর্ঘটনায় নিহত অমুক” “দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি” এর পর আর কোন রিপোর্ট নেই। যদি কোন প্রেস রিলিজ আসে কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কেন ব্রিফিং করেন তাহলে সেই তথ্যকে বিনা চ্যালেঞ্জ ছেড়ে দিয়ে সংবাদ বলে প্রচার করি।
সংবাদ কর্মী হিসেবে প্রশ্ন হলো: সবকিছুই কি দুর্ঘটনা? নাকি আমরা সাংবাদিকরা জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি ব্যবহার করে ঘটনাটিকে এমন এক চাদরে ঢেকে রাখি, যেখানে আর প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না?
আচ্ছা দুর্ঘটনাই হল । কিন্তু দুর্ঘটনা বলা মানেই কি দায়মুক্তি? আমরা শব্দচয়নে যত সহজেই “দুর্ঘটনা” লিখে ফেলি, ঠিক ততটাই সহজে যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে যায়। পাঠকের মনেও তৈরি হয় এক ধরনের প্রোগ্রামড উপলব্ধিÍ” হয়েই থাকে এমন”!!। অথচ একটি প্লেন ওড়ার আগে-পরে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বিমানের রুটিন চেকআপ ঠিকভাবে হয়েছিল কি? পাইলট শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন কি? বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কোনো গাফিলতি ছিল কি? উড়ানের সাথে সংশ্লিষ্ট কারে সন্দেহজনক কোন আচরণ করছিল কি? সর্বোপরি আভ্যন্তরীণ ও বহি: বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থ এতে জড়িত কি? কোন ব্রান্ডের প্লেন , কোন দেশ এর প্রস্তুতকারক? সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব মোড়লরা উড় জাহাজের বাণিজ্য নিয়ে কি বলেছে? তার কোন লিংক কিনা? এই উড়োজাহাজের দুর্ঘটনায় কোন শেয়ার মার্কেটে প্রভা পড়েছে কিনা? পাইলট কি ইচ্ছাকৃতভাবে বিমান বিধ্বস্ত করতে পারেন? আমাদের দেশে কি পাইলটদের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া রয়েছে? বিশ্ব ইতিহাসে এমন অনেক নজির রয়েছে, যেখানে পাইলট মানসিক বিপর্যয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বিমান বিধ্বস্ত করেছেন। এমন সহজ প্রশ্ন গুলিকে কঠিন ভেবে আমরা এড়িয়ে যাই। প্রশ্ন করা মানে কাউকে অবহেলা করা নয়। বরং প্রশ্ন করা মানে সত্যের সন্ধান করা। অবশ্যই তা জনস্বার্থে।
একটু অন্য ভাবে দেখি। আচ্ছা উড়োজাহাজের দুর্ঘটনা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হ্যাকিং কি সম্ভাবনা নয়? আধুনিক প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবন সহজ করেছে, তেমনি হ্যাকিং বা সাইবার আক্রমণ বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অনিরাপদ করতে পারে। এটাতো অসম্ভব কিছ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি হাজারো মাইল দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে পেজারের মত ছোট্ট একটি ডিভাইসে বিস্ফোরণ করা হয়েছে। আবার দেখেছি বিশ্লেষণ ওয়ারলেস সেটে বিস্ফোরণ । এসব ঘটনায় মানুষও নিহত হয়েছে। তাই বর্তমান সময়ে সংবাদ করতে হলে প্রযুক্তির দিকটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কই। আবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিস্ফোরণের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের সংবাদ বিশ্লেষণে এসব প্রশ্ন কোথায়? আমরা কি সচেতনভাবে এড়িয়ে যাই? নাকি আমাদের সাংবাদিকতার কাঠামোই এমন যে প্রশ্ন করাকে “অতিরঞ্জন” মনে করা হয়?
আমাদের সীমাবদ্ধতা – দুর্ঘটনার পরপরই সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। সরকারি কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে চায় না। ভয় ও চাপ থাকে এটাকে নেই বলার সুযোগ নেই। কর্তৃক বা গোয়েন্দা সংস্থার চাপ আমরা সাংবাদিকরা অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকি । প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা আমাদের প্রশ্ন তৈরির বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যে সাংবাদিক নিত্য দিনের বাজার দর বিশ্লেষণ করে তাকেই এ জাতীয় বিষয়ে রিপোর্ট করতে পাঠানো হয়। অপরদিকে
সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতায় উৎসাহ না দিয়ে শুধুই তথ্য পুনরাবৃত্তি করে। ফলে সত্য অনুসন্ধানে বাধা আসে।
‘উড় জাহাজ দুর্ঘটনা’ মানেই যেন দায়মুক্ত এক শব্দ। সাংবাদিকদের কাজ হওয়া উচিত শব্দের চাদরের নিচে লুকানো বাস্তবতাকে তুলে ধরা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সাংবাদিকতায় এই প্রশ্নগুলো করার প্রবণতা নেই: “এটা কেন ঘটলো?”, “কে দায়ী?”, “আরো কিছু লুকানো আছে কি?” সাংবাদিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব “দুর্ঘটনা” বলেই চুপ করে যাওয়া নয়, বরং প্রশ্ন জাগানো, উত্তর খোঁজা, এবং মানুষের সামনে সম্ভাব্য সত্যকে তুলে ধরা। চাপ তো থাকবেই । চাপ ছাড়া সাংবাদিকতা ঠিক যায় না। পরিশেষে বলতে চাই ‘দুর্ঘটনা’ নয়, সত্যের খোঁজ হোক সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য”।
লেখক : সংবাদকর্মী











































