ইরাবতী ডলফিন পর্যটন শিল্পের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ

12


-ফাতেমা তুজ জোহরা
বিশ্বে বিলুপ্ত হতে বসা ইরাবতী ডলফিন সর্বোচ্চ সংখ্যায় আছে বাংলাদেশে। পৃথিবীতে প্রায় ৭০০০টি ইরাবতী ডলফিনের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশের সুন্দরবনে ও উপকূলীয় এলাকায় পাওয়া যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো একদিকে যেমন বিশাল প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের আধার তেমনি বিশ্বজুড়ে বিপন্নপ্রায় প্রজাতির মিঠাপানির ডলফিনেরও বড় আবাসস্থল। এটি দেশের জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে বৈশ্বিক সঙ্কটের পাশাপাশি বাংলাদেশের নদীগুলোতেও ডলফিনের আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ক্রমাগত নদীদূষণ, অপরিকল্পিত বাঁধ, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, ডলফিন আবাসস্থল ধ্বংস এবং শিকার ইত্যাদি নানা কারণে নদীর প্রাণ বিপন্নপ্রায় এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটি নানাভাবে হুমকির মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংরক্ষণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ না নিলে এই প্রজাতি আরও বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
ইরাবতী ডলফিন (বৈজ্ঞানিক নাম: ঙৎপধবষষধ নৎবারৎড়ংঃৎরং) সুন্দরবনের নদী, খাল এবং উপকূলীয় জলাশয়ে বসবাস করে। ইরাবতী ডলফিনের নামকরণ হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইরাবতী নদী (আয়েয়ারওয়াদি নদী, মায়ানমার) থেকে, যেখানে এটি প্রথম চিহ্নিত হয়েছিল। ১৮৬৬ সালে ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ জন অ্যান্ডারসন এই প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেন। তবে সুন্দরবনে এর উপস্থিতি অনেক আগে থেকেই ছিল বলে ধারণা করা হয়, কারণ এই অঞ্চলের নোনা ও মিঠা পানির মিশ্রণ এদের বসবাসের জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় জেলে ও বনবাসীদের মধ্যে এই ডলফিন সম্পর্কে মৌখিক ইতিহাস ও গল্প প্রচলিত ছিল, যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এর উপস্থিতি পরে নিশ্চিত হয়। সুন্দরবন, যা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত, ইরাবতী ডলফিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। ইরাবতী ডলফিন দেখতে সাধারণত ধূসর বা নীলচে ধূসর রঙের ও পেটের দিক ফিকে বর্ণের হয়। এরা লম্বায় ১.৮-২.৭৫ মিটার হয়ে থাকে এবং ওজন ৯০-২০০ কিলোগ্রাম। ইরাবতী ডলফিন ৭০-১৫০ সেকেন্ড পর পর শ্বাস নেয়ার জন্য ভেসে উঠে। এদের মাথা গোলাকার। প্রতি চোয়ালে ১২-১৯টি দাঁত থাকে। এদের সাধারণত নোনা পানি ও নদীর মোহনায় বেশি দেখা যায় এবং মাঝে মাঝে মিঠা পানির নদীতেও দেখা যায়। এদের প্রধান খাবার হলো মাছ, সামুদ্রিক স্কুইড, অক্টোপাস আর চিংড়ি। সাধারণত এরা দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে। এই প্রজাতি ৭-৯ বছরের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয় আর ২-৩ বছরে একটি বাচ্চা প্রসব করে। বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডলফিনের যত প্রজাতি আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইরাবতী ডলফিন। এর যেসব বৈশিষ্ট্য আছে, তার সঙ্গে অনেকে মানুষের মিল খুঁজে পান তারা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বন্য প্রাণীবিষয়ক সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) পক্ষ থেকে ২০০৬ সালে প্রথম বাংলাদেশের ডলফিনের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ করা হয়। এরপর একই সংস্থা আলাদাভাবে ২০০৯ সালে একটি জরিপ চালিয়ে জানায় যে, সুন্দরবন ও এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৬,০০০ ইরাবতি ডলফিন রয়েছে। এটি বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় এই প্রজাতির সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা। এই আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিদদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছিল এবং সুন্দরবনকে এই ডলফিনের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি উঠেছিল। এরপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ডলফিনের আবাসস্থল রক্ষা ও বংশবৃদ্ধির জন্য মোট ৬টি অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে। এগুলোর মধ্যে ৩টি অভয়ারণ্য সুন্দরবনে অবস্থিত যা ২০১২ সালে ঘোষিত হয়েছে। এই তিনটি অভয়ারণ্যের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২ কিলোমিটার এবং আয়তন প্রায় ১০.৭০ বর্গ কিলোমিটার। অন্য ৩টি অভয়ারণ্য পদ্মা ও যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে অবস্থিত যা ২০১৩ সালে ঘোষিত হয়েছে। এই ৬টি অভয়ারণ্য ছাড়াও বঙ্গোপোসাগরের সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড এলাকায় সরকার ২০১৪ সালে ডলফিন ও তিমি রক্ষায় একটি অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে।
ইরাবতী ডলফিন বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সংকটাপন্ন ও পৃথিবীতে বিপন্ন অবস্থায় আছে। প্রতিনিয়ত ডলফিনের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে যার কারণ হচ্ছে জেলেরা অতিরিক্ত মাত্রায় ও অপরিকল্পিতভাবে মাছ শিকার করে এবং সুন্দরবনের খালে বিষ বা কীটনাশক প্রয়োগ করে। মাছ ধরার জালে ডলফিন আটকা পড়ে মারা যায়। ডলফিনের আবাসস্থলে অতিরিক্ত নৌযান চলাচল ও তার থেকে নিঃসরিত তেল ও বর্জ্যের কারণে নদী দূষিত হয় ফলে ডলফিনের আবাসস্থল ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর পানির লবনাক্ততা বেড়ে ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
ইরাবতি ডলফিন সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরা শিকারী প্রাণী নয়, অত্যন্ত উপকারি নিরীহ একটি প্রাণী। এরা মাছ ও অমেরুদন্ডী প্রাণী খেয়ে জীবনধারণ করে যা জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এই ডলফিনগুলো প্রায়ই ‘নদী রক্ষক’ হিসেবে বিবেচিত হতো কারণ এদের উপস্থিতি মাছের প্রাচুর্যের ইঙ্গিত দিত। এরা জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক রাখার সাথে সাথে মাছের বংশ বিস্তারে সহায়তা করে। বড় ও শিকারি মাছ খেয়ে ছোট মাছের বেড়ে উঠার সুযোগ করে দেয়। এছাড়া অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত মাছ খেয়ে জলজ পরিবেশে রোগ বিস্তার রোধ করে। ডলফিনকে উপকূলীয় প্রতিবেশের প্রহরীও বলা হয়। তাছাড়া নদীতে দূষণের পরিমাণ কেমন তা ডলফিনের অবস্থা ও সংখ্যা থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায়।
২০১৭ সালে ইউএনডিপি এবং গ্লোবাল এনভাইরনমেন্টাল ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) এর আর্থিক সহযোগিতায় ‘গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য রক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ প্রকল্প’ নামে বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর তিন বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল। এই প্রকল্পে ডলফিন সম্পর্কিত নানা ধরণের গবেষণার পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায়ের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ডলফিন সংরক্ষণে ডলফিন কনজারভেশন টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া শুশুক মেলা, প্রচারণা, স্কুল কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষদের ডলফিন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ডলফিন সংরক্ষণে বন অধিদপ্তররের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা করা হয়েছে। স্মার্ট পেট্রোলিং পরিচালনার জন্য অধিদপ্তরের প্রায় ১০০ জন কর্মীকে প্রশিক্ষন দিয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে স্মার্ট পেট্রোলিং টিম ডলফিন অভয়ারণ্য নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশব্যাপী ডলফিন সংরক্ষণ কার্যক্রম আরো জোরদার করার জন্য এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন অধিদপ্তর কর্তৃক শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিনকে জাতীয় জলজ প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ডলফিন সংরক্ষণ আরো গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ( সংরক্ষন ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর তফসিল-১ অনুযায়ী তিমি বা ডলফিন সংরক্ষিত। এই আইনের ৩৭ ধারা মোতাবেক তিমি বা ডলফিন হত্যা করা এবং এর দেহের কোন অংশ সংগ্রহ, দখল বা ক্রয়-বিক্রয় করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শাস্তির বিধানগুলো হচ্ছে- তিমি বা ডলফিন হত্যা করলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদন্ড বা ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড প্রদান করা হবে। একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ড বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড প্রদান করা হবে। তিমি বা ডলফিনের দেহের কোন অংশ সংগ্রহ, দখল, ক্রয়-বিক্রয় বা পরিবহন করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদন্ড বা ১ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে প্রদান করা হবে। একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ ৪ বছরের কারাদন্ড বা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড প্রদান করা হবে। ডলফিন সংরক্ষণের জন্য এ আইন ও বিধিনিষেধ এর সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন। আমরা আশা করবো আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির এ ব্যবস্থা আরো জোরদার হবে।
ডলফিন পর্যটনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নে। সঠিক নিয়ম মেনে ডলফিন পর্যবেক্ষণ করা হলে এটি টেকসই পর্যটনের একটি মডেল হতে পারে। তবে ডলফিনের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা এবং তাদের বিরক্ত না করার জন্য দায়িত্বশীল পর্যটন চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হলে ডলফিন পর্যটন শিল্পের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হতে পারে।
ডলফিন শুধু সমুদ্র ও নদীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না বরং আমাদের পরিবেশের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডলফিন শুধু পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে না, তারা আমাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত জীবনের অংশ। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে ডলফিন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আশার কথা হলো, আমাদের দেশে ডলফিনের আবাসের জন্য বিস্তীর্ণ জলরাশি রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব শুধু নিজেদের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ডলফিনের এ সুন্দর প্রজাতিকে সংরক্ষণ করা।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস