সৈয়দ রানা কবীর
মাটির কোনো স্পর্শ ছাড়াই চারা তৈরি করে সাড়া ফেলেছে সাইদুর রহমান নামের এক যুবক। মাটির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে জৈবসার মিশ্রন ও নারিকেলের ছোবড়া। নেট হাউজের ভেতরে উৎপাদন করায় রোগ থেকে রক্ষা পাচ্ছে এসব চারা। আর আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করায় এসব চারার মানও বেশ ভাল।
এই পদ্ধতির নাম ‘কোকোডাস্ট’। কোকোডাস্টের এই পদ্ধতিতে চারার মৃত্যুর হার নেই বললেই চলে। চারা সুস্থ ও সবল থাকে। যার কারণে পোকামাকড় ও রোগবালাই কম হয়। সর্বোপরি এই চারার মাধ্যমে সবজি চাষ করলে কৃষক শতভাগ লাভবান হয়। শুধু স্থানীয় কৃষকরাই যে এতে আগ্রহ হচ্ছে তা নয়, বাণিজ্যিকভাবে এসব চারা যাচ্ছে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
জানাযায়, যশোর ও শৈলকুপা উপজেলায় শেডের চারদিকে নেট (জাল) দিয়ে ঘিরে কোকোডাস্ট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করছেন নার্সারি মালিক ইমতিয়াজ উদ্দিন সেলিম ও সাইদুর রহমান।
যশোর এলাকার ইমতিয়াজ উদ্দিন সেলিম ও শৈলকুপার সাইদুর রহমান ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিতে আসেন তারা। একপর্যায়ে চারা কিনতে ঝামেলা হওয়ায় নিজে নিজে তারা চারা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন উদ্যোক্তাতারা।
শুরুতে অনলাইনের মাধ্যমে নারিকেলের ছোবড়া, প্লাস্টিকের ট্রেসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় ও অফিসের সামনে চারা উৎপাদন করেন উপজেলার সাইদুর রহমান। প্রথমে ৫ হাজার চারা উৎপাদন করলেও বর্তমানে তাদের নার্সারিতে এখন পাঁচ লাখের বেশি চারা তৈরির ধারণক্ষমতা রয়েছে। টাইটান এগ্রো ও লামিয়া এগ্রো নামের এই নার্সারি গুলোতে বর্তমানে টমেটো, মরিচ, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, স্কচ, লেটুসপাতা, পেঁপে, লাউ, ফুলকপি ও বাঁধাকপিসহ ১৫ থেকে ২০ ধরণের চারা তৈরি হচ্ছে। প্রথম দিকে তেমন সাড়া না পেলেও বর্তমানে প্রতি মাসে থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি হচ্ছে, যা পৌঁছে যাচ্ছে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
সরেজমিনে লামিয়া ও ‘টাইটান এগ্রো’তে সারি সারি প্লাস্টিকের ট্রে সাজানো। তাতে সারিবদ্ধভাবে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির শাকসবজির চারা। তবে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এসব চারার সঙ্গে মাটির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
যশোর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানাযায়, চারা উৎপাদনে আধুনিক এই পদ্ধতিটি সবখানেই ছড়িয়ে দিতে পারলে ফসল উৎপাদনে ভালো ফলন পাবেন কৃষক। এ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনে কোনো কীটপতঙ্গ আক্রমণ করতে পারে না। ফলে সুস্থ ও সবলভাবে বেড়ে ওঠে চারা। প্রতি শতাংশ জমিতে কোকোডাস্ট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি হয় লাখ টাকার বেশি।
উদ্যোক্তা ইমতিয়াজ উদ্দিন সেলিম ও সাইদুর রহমান বলেন, কোকোডাস্ট ব্যবহার করে কেঁচো সারের সমন্বয়ে মাটি ছাড়াই সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে প্লাস্টিক ট্রে তে। আধুনিক এ পদ্ধতিতে তৈরি হাউজের চারপাশে নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। যেখানে পর্যাপ্ত পরিমানের আলো বাতাস প্রবেশ নিশ্চিত হয় এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় থেকেও সবজির চারাগুলো রক্ষা পায়। তাপ নিয়ন্ত্রণ ও ঝড়-বৃষ্টি থেকে চারাগুলো নিরাপদে রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ পলিথিন।
ইমতিয়াজ উদ্দিন সেলিম জানান, তিনি মূলত একজন সাধারণ কৃষকও ছোট ব্যবসায়ী । করোনার সময়ে যখন ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায় তখন কৃষিতে আসার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে আমার আঙ্গিনার ও অফিসের সামনে উভয়ে প্রায় ১০ হাজার চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর তাদের বাড়ির পাশে একপ একে তার দুটি কারখানা তৈরি করে। সেখানে বর্তমানে তাদের প্রায় পাঁচ লাখ চারার তৈরির উপযোগী হয়েছে।
তারা উভয়ে জানান, বাজারের অন্যান্য চারার থেকে দাম একটু বেশি হলেও চারা মারা যাওয়ার হার একদমই কম। তবে এটা অনেকেই কিন্ত বুঝতে চায় আবার অনেকে তা বুঝতে চায়না। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫ শতাংশ কৃষক এই সিডলিং নার্সারি করে বলে তারা জানান। আধুনিক এই পদ্ধতিতে উৎপাদন হওয়া চারা দিয়ে নার্সারি করলে সকলেই বেশি লাভবান হবে বলে আমি তারা মনে করেন।
এদিতে তার আধুনিক এই নার্সারিতে চারা তৈরি ও পরিচর্যায় কাজ করছেন প্রায় ১০/১২ জন শ্রমিক। তারা বলছেন, প্রতি মাসে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন তারা। এতে তাদের সংসারেও ফিরেছে আর্থিক সচ্ছলতা।
ইব্রাহিম নামে এক শ্রমিক বলেন, সবজির চারাতে ওষুধ, সার, পানি দেওয়াই আমার কাজ। এছাড়া যারা চারা কিনতে আসেন তাদের সহযোগিতা করি। মাসশেষে যে টাকা পাই তা দিয়েই আমার সংসার ভালোভাবে চলছে।
এদিকে শৈলকুপা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, কৃষক সাইদুর রহমান প্রথমে আমাদের কাছ থেকে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাকে আমরা কৃষি লোনসহ কিভাবে চারা উৎপাদন করতে হয় সেই প্রশিক্ষণ আমরা দিয়েছি। বর্তমানে সেখানে আরও একটি মশলা প্রকল্পের চারা উৎপাদনের জন্য আধুনিক শেড তৈরি করতে যাচ্ছি। মৌসুমের আগেই বাজারে যে সবজির দাম বৃদ্ধি থাকে সেসময় কৃষক আগাম সবজি বিক্রি করে অধিক লাভবান হয়। এ কারণে মাটি ছাড়া চারা উৎপাদনপদ্ধতি ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি আগামীতে দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলবে বলে আশা করেন।











































