ক্যালিপসো ক্রিকেট আর সাম্বা ফুটবলের কদর কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?

3
Spread the love


স্পোর্টস ডেস্ক।।
১৯৮৩ সালের ২৫ জুন লর্ডসে ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় আগের দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল ভারত। তখন ক্যারিবীয় ক্রিকেটের দৌর্দণ্ডপ্রতাপ। ক্যারিবিয়ান সাগরের ঢেউয়ের মতো উপচে পড়ে আনন্দময় সেই ক্রিকেটের রূপরসগন্ধ। বর্ণে, ছন্দে, গীতিতে হৃদয়ে দোলা দেয় ক্যালিপসো ক্রিকেট।

সেই দলটিতে কে কে ছিলেন? সেটা না বলে বরং বলা যেতে পারে, কে কে ছিলেন না? গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হেইনস, ভিভ রিচার্ডস, ক্লাইভ লয়েড, ল্যারি গোমস, ফাউদ বাক্কাস, জেভ ডুজন, ম্যালকম মার্শাল, অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, মাইকেল হোল্ডিং। দুই-একজন ছাড়া দলের সবাই এক একজন ক্রিকেট আকাশের ধ্রুবতারা। এখনো নামগুলো কেমন নস্টালজিক করে তোলে।

ব্যাটসম্যানরা যদি হন বুনো ওল, তাহলে বোলারদের বাঘা তেঁতুল বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। ব্যাটিং লাইনের সামনে প্রতিপক্ষের বোলারদের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয়ে যেত। আর বোলারদের সামনে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা কাঁপতে কাঁপতে মনে মনে আওরাতেন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এই দলটিকে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা বলা যায়? আপনি যত বড় ক্রিকেট অনুরাগী হন কেন, এ দলটিকে পছন্দ না করলে বুঝতে হবে আপনার ক্রিকেট প্রেমে ঘাটতি রয়েছে। ক্রিকেট যতই অনিশ্চয়তার খেলা হোক, তাই বলে সেই দলটি ক্রিকেট বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক শিরোপা জয় করবে না?

দুনিয়াটা বড় অদ্ভুত। কখনো কখনো এমন সব ঘটনা ঘটে, যার কোনো কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুবা একটি বরফের টুকরোর সঙ্গে ধাক্কা লেগে কেন ডুবে যাবে টাইটানিকের মতো বৃহদাকার সামুদ্রিক জাহাজ? কেন ফাইনালে হেরে যাবে প্রতাপশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ? ভারতের দেওয়া ১৮৪ রানের টার্গেটের সামনে ১৪০ রানে গুটিয়ে যায় ক্যারিবীয়রা! এ কী করে সম্ভব? এই ধাক্কার রেশ আর সামাল দেওয়া যায়নি। তাহলে সেদিন কি অস্ত যায় ক্যারিবীয় ক্রিকেটের গৌরবরশ্মি? নতুবা এরপর দলটি কেন চ্যাম্পিয়ন হতে পারে না? মারকাটারি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মাঝে মাঝে ঝলক দেখালেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের আবেদনময়ী সেই ক্রিকেট যেন স্থান করে নিয়েছে মিউজিয়ামে। সে রামও নেই সে অযোদ্ধাও নেই। তাছাড়া সময়টাও এখন এমন, ক্যালিপসো ক্রিকেটের সেই কদর নেই বললেই চলে।

ফুটবলে মজে থাকবেন আর ব্রাজিলীয় ‘জোগো বোনিতো’ অর্থাৎ দ্য বিউটিফুল গেম’কে উপেক্ষা করবেন, এটা কিভাবে সম্ভব? হতে পারে আপনার ফেবারিট দল আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন বা ইংল্যান্ড। তাতে কী? ব্রাজিলের ফুটবলীয় সৌন্দর্য, সুষমা, লাবণ্য কি আপনার মনকে একটুও মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেবে না? তার রূপ-সুধা কি আপনাকে আপ্লুত করবে না? এই দলটি সবুজের বুকে যখন সূর্যমুখী ফুলের মতো দোলা দেয়, আপনার বুকে কি অদ্ভুত এক শিহরণ খেলে যায় না? নিশ্চয়ই এতটা নিষ্ঠুর আপনি নন।

বিশ্ব ফুটবলকে আনন্দময় করে তোলার ক্ষেত্রে এই দলটির অবদান অস্বীকার করতে পারবেন না। পেলে, ভাভা, গ্যারিঞ্চা, দিদি, জইরজিনহো, জিকো, সক্রেটিস, জুনিয়র, রোমারিও, বেবেতো, রবার্তো কার্লোস, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো- ফুটবল বাগানে ফুটে থাকা থোকা থোকা হলদে ফুল। এর বাইরেও রয়েছে সৌরভ ছড়ানো কত শত ফুটবলার। পাঁচবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখলেও ব্রাজিল সবার হৃদয় কেড়েছে তাদের সৌকর্যময় আর মনরাঙানো ফুটবলশৈলী দিয়ে। জয়ের চেয়ে দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য বরাবরই খেলে এসেছে। একইসঙ্গে পেয়েছে সাফল্যও।

২০০২ সালে স্পেনে বিশ্বকাপ ফুটবলে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। এরপর থেকে শিরোপা জিততে না পারার পাশাপাশি ব্রাজিল অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে আনন্দময় ও সুন্দরতম ফুটবল। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে জার্মানি। সেদিন কি ব্রাজেলীয় ফুটবলের মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায়? যদিও এ দলটিতে ব্রাজিলের ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের কেউ ছিলেন না। তারপরও এই হার ব্রাজিল ফুটবলকে শুধু কলঙ্কিতই করেনি, নিয়ে গেছে খাদের অতলে। এরপর থেকে ব্রাজিল আর আগের মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।

এবার কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। তাতে দলটির অনেক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলের খেলোয়াড়দের ফিজিক্যাল ফিটনেস নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। রাফ অ্যান্ড টাফ ফুটবলের মোকাবিলা করতে গিয়ে তারা হিমশিম খেয়ে যায়। ফিজিক্যাল টাসলে সুবিধা করতে পারে না। ব্যালেন্স রাখতে না পেরে ঘন ঘন ভূপাতিত হয়। এটা এখন হাসির খোরাক হয়ে ওঠেছে। বুঝলাম, প্রতিপক্ষ রাফ বা গা-জোয়ারি ফুটবল খেলে। তা তো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ পর্যায়ের ফুটবলে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। আর দলটি যেহেতু ব্রাজিল, সেই কারণে তাদের তো আরো বেশি কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা আছে, দলের এমন একজনকে সুপারস্টার হিসেবে বেছে নেয় ব্রাজিল। তার কাঁধেই সমস্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। একটা সময় নেইমার জুনিয়রকে নিয়েও অনেক মাতামাতি করা হয়েছে। খুব অল্প বয়সেই তার ওপর গুরু দায়িত্ব দেওয়ায়, সেই ভার নিতে না পারায় ভেঙে পড়েন তিনি। এ কারণে তার পক্ষে আর স্বাভাবিক খেলা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে তার ওপর অধিক মাত্রার নির্ভরশীল হয়ে খেসারত দিতে হয়। সেমিফাইনালে নেইমার খেলতে না পারায় ৭-১ গোলে হারতে হয়েছে। ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও নেইমার নির্ভরতা কোনো কাজে আসেনি। ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকায় সাফল্যের প্রধান কারণ, ব্যক্তি ইমেজের চেয়ে সম্মিলিতভাবে দলীয় প্রচেষ্টা।

সেই ধারায় এবার নির্ভর করা হয় মূলত ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাঁধে। কোয়ার্টার ফাইনালে তার অনুপস্থিতিতে হেরে যায় ব্রাজিল। তার পরিবর্তে গোল করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তরুণ এনড্রিককে। তার বয়স কত? ১৮-এর কাছাকাছি। বুঝলাম তিনি প্রতিভাবান ফুটবলার কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচ জয় তো এত সহজ নয়। এনড্রিককে ভরসা করে উরুগুয়ের সঙ্গে ৪-২-৩-১ ছকে খেলা হয়। এই ছকের কারণে আগেভাগেই বিদায় নিতে হয়েছে। একটা সময় জুটি বেঁধে সাফল্য পেয়েছে ব্রাজিল। কী সব অসাধারণ জুটি। আর সেই দলটিকে এখন একজন ফুটবলারকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হয়! ব্রাজিল এই আত্মঘাতী কৌশল থেকে বের হতে না পারলে এভাবেই বারবার ফিরে যেতে হবে।

ব্রাজিল মূলত দুনিয়া মাত করেছে সাম্বা ফুটবল দিয়ে। ফুটবলের সেই দুর্লভ শিল্প বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর কারণ, এখন বোধকরি আগের মতো তার কদর নেই। শিল্পীদের যদি সহায়তা বা সমর্থন না দেওয়া হয়, তাহলে তো হারিয়ে যাবেনই। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেই ফুটবলশিল্পীই-বা কোথায়? ফুটবলশিল্পের দেশ যেহেতু ব্রাজিল, সেখানে শিল্পী ফুটবলারদের সমাগম আছে; কিন্তু বিশ্ব ফুটবলে তো তাদের সমাদর নেই। তাহলে শিল্পী ফুটবলাররা উঠে আসবেন কীভাবে?

ক্যালিপসো ক্রিকেট আর সাম্বা ফুটবলে উত্তাল ছিল ক্রীড়াঙ্গন। সময়ের পরিক্রমায় তার খায়খাতির হ্রাস পাওয়ায় ফুটবল এবং ক্রিকেট দলগুলোর মধ্যে আর মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কে কোন ঘরানার, সেটা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। হরেদরে সব যেন একাকার হয়ে গেছে। জয়-পরাজয় দিয়েই পরিমাপ করা হয়, কোন দল কেমন? যে কারণে ক্রীড়াঙ্গন হারিয়েছে তার মাধুর্য।