থানায় আ.লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় আহত ৩০, মামলায় আসামি ৫০০

6
Spread the love


ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহের শৈলকূপা থানায় হামলা চলিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। এতে আহত হয়েছেন ৮ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন। হামলার সময় ভাংচুর করা হয়েছে পুলিশের গাড়ি ও মোটরসাইকেল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৩০ রাউন্ড শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

এদিকে পুলিশের গুলিতে আহত গ্রামবাসীদের মধ্যে ১২ জনকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া শেষে ঝিনাইদহ সদর থানায় আনা হয়েছে।

এ ঘটনায় ১১৪ জনের নাম উল্লেখ করে ৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই মামলার বাদী পুলিশ। এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আহতদের মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্যকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে এবং একজন পুলিশ সদস্যকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হয়েছেন তিনি।

উপজেলার ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের ধাওড়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এজাহারভুক্ত আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মোস্তাক সিকদারকে আটক করা নিয়ে রোববার বিকাল ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।

শৈলকূপা থানা পরিদর্শন করেছেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. হাসানুজ্জামান। উপজেলা শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান নিয়েছে থানা এলাকায়। যে কোনো সময় অভিযানে নামবেন তারা।

ঘটনার বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান জাকারিয়া জানান, দুপরের দিকে উপজেলার ধলহরা চন্দ্র ইউনিয়নের ধাওড়া গ্রাম থেকে একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মোস্তাক সিকদারকে আটক করা হয়। বেলা অনুমান ২টা ৩০ মিনিটের দিকে শৈলকূপা থানায় আনা হয় তাকে। কিছু সময় পরে শত শত গ্রামবাসী নসিমন করিমন মোটরসাইকেলে চড়ে থানার সামনে দিয়ে পৌরসভার দিকে চলে যায়। সেখান থেকে ফিরে বিকাল অনুমান ৩টার দিকে তারা মিছিল সহকারে থানার সামনে জড়ো হয়।

আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় থানার প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডাক চিৎকার দিতে দিতে থানার প্রধান ফটক ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে তারা। একপর্যায়ে বৃষ্টির মতো ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে দেয় তারা। পুলিশ প্রথমে সাউন্ড গ্রেনেড এবং শটগানের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় থানা চত্বর। অন্তত ৮ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।

ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন শৈলকূপা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অমিত কুমার বর্মণ। তিনি জানান, হঠাৎ করে শত শত জনতা থানা আক্রমণ করে বসে। সে সময় পুলিশ সদস্যরা বিশ্রামে ছিলেন। আক্রমণকারীরা বেপরোয়াভাবে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন। এ ধরনের আক্রমণের বিষয়ে আগাম কোনো খবর ছিল না বলে জানান অমিত কুমার বর্মণ।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শনিবার উপজেলার ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের দাউটিয়া বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার জের ধরে রোববার এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ওই এলাকায় যায় এবং আগের একটি মারামারির ঘটনায় ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের ধাওড়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মো. ফরিদ হাসানের দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত ৪৯নং আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মোস্তাক সিকদারকে আটক করে।

এ আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকার আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের লোকজন উপজেলা শহরে ছুটে আসেন। তারা বর্তমান নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান মন্নু ও শৈলকূপা পৌরসভার মেয়র কাজী আশরাফুল আজমের গ্রুপের। নসিমন করিমন মোটরসাইকেলে চড়ে অন্তত ৫০০ সরকার দলীয় সমর্থক শৈলকূপার থানার সামনে দিয়ে পৌর ভবনে যায়। সেখান থেকে মিছিল করতে করতে থানার প্রধান ফটকে আসে তারা। পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে তারা।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ ঘটনার মাত্র কয়েক মিনিট আগে থানা পুলিশকে অবহিত করে গোয়েন্দারা। ততক্ষণে হামলা শুরু হয়ে যায়। পুলিশ সদস্যরা ওই সময় থানা মসজিদে বিশ্রামে ছিলেন। দ্রুত প্রস্তুতি নিতে নিতে ইটপাটকেলে কাবু হতে থাকেন তারা। পুলিশের গুলির জবাবে আক্রমণকারীরা বৃষ্টির মতো ইট ছুড়তে থাকে। কেউ কেউ লাঠি দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে।

ঘটনার আধঘণ্টা পরে শৈলকূপা থানায় পরিদর্শনকালে দেখা যায়, থানা চত্বর, সিঁড়ি, বারান্দায়, থানা ভবনের দ্বিতীয় তলার ভবনে পুলিশ ব্যারাকে জমাট বাঁধা রক্ত। থানা চত্বরে ইটের স্তূপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গুলির খোসা পড়ে আছে বিভিন্ন স্থানে। সন্ধ্যায় ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনস থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়। ছুটে আসেন র্যাব সদস্যসহ এনএসআইয়ের গোয়েন্দারা।

রাতে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. হাসানুজ্জামান শৈলকূপা থানা পরিদর্শন করেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আজিম-উল-আহসান জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি উচ্চমহলকে অবহিত করা হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, দায়ের করা মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারের জন্য টানা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গ্রেফতার এড়াতে ধলহারা চন্দ্র ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের মানুষ আত্মগোপন করে আছেন।