আলোচনায় শাহীনের রিসোর্ট: এমপি হত্যায় পরতে পরতে রহস্য

61
Spread the love


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের সরকারি নলডাঙ্গা ভূষণ হাই স্কুল সংলগ্ন এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের বাসভবনের সামনে বৃহস্পতিবার দুপুরেও শোকের মাতম। বড় ভাই এনামুল হক ইমানকে ঘিরে আত্মীয়-স্বজন ও নেতাকর্মীরা। সবার মধ্যে নেতাকে হারানোর শোক। বাসভবনের পাশেই উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়। যেখানেও এমপি আনারের অনুসারীরা ভিড় করেছেন। হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে ফিসফাস থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ কথা বলছেন না।


কলকাতার নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে খুন হন ঝিনাইদাহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার। এ হত্যাকাণ্ডে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নাম এসেছে আকতারুজ্জামান শাহীন নামে এক ব্যক্তির। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পরিকল্পনায় কেবল যে শাহীনই ছিলেন এমনটা নাও হতে পারে। এ ঘটনার ডালপালা হয়তো অনেকদূর বিস্তৃত। শাহীন নিজে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।


তিনি আবার এমপি আনোয়ারুল আজিমের দীর্ঘদিনের বন্ধু। পারিবারিকভাবে পরিচয় হলেও এক সময় দুইজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে এলাকায় ভালো খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত আনোয়ারুল আজিম স্বর্ণ, মাদক, চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। যে কাজে তার সঙ্গে ছিলেন পরিতোষ ঠাকুর নামে এক ব্যক্তি। ১৯৯৩ সালে কালীগঞ্জ পৌরসভায় কমিশনার নির্বাচিত হন আনার। তখন তার ব্যবসা আরও বড় হতে থাকে। এক সময় এ অবৈধ ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ আসে আনোয়ারুল আজিমের হাতে। ঝিনাইদাহসহ আশপাশের জেলার ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে চলতো আনারের মাদক কারবার। এ ছাড়াও এসব এলাকা ব্যবহার করে চলতো স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডি, নারীপাচারের মতো কাজ। এসব তথ্যের সত্যতা মেলে এলাকায় গিয়েও। সবার একটাই কথা, তিনি কী ব্যবসা করেন তা সবাই জানে। কিন্তু বলা যাবে না।
শাহীনের সঙ্গে আনারের সম্পর্কের শুরুটা কীভাবে তা নিয়ে নানা আলোচনা।

আনারের বড়ভাই এনামুল হক ইমান বলেন, আমার সঙ্গে শাহীনের বড় ভাইয়ের পরিচয় ছিল। সেখান থেকে ওদের পরিচয়। অনেক আগ থেকেই এ সম্পর্ক। কিন্তু সে আমার ভাইকে আজ হত্যা করেছে। এদিকে এমপি আনোয়ারুল আজিম ও শাহীনের সম্পর্কের সত্যতা মেলে শাহীনের রিসোর্টে গিয়েও। এই এলাকায় অবস্থিত নিলাম ভিটা নামের ওই রিসোর্টে যাতায়াত ছিল আনারেরও। প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা ওই রিসোর্ট এলাকাবাসীর কাছে একটা বিস্ময়। এলাকার কোনো মানুষ কোনোদিন রিসোর্টে প্রবেশ করতে পারতেন না। কিছুদিন পরপর এই রিসোর্টে পার্টি হতো। যেখানে মাদক, নারী, গান বাজনা সব চলতো। যারা এ রিসোর্টে আসতেন সবাই কালো গ্লাসের গাড়িতে প্রবেশ করতেন। বাইরে থেকে কে ঢুকছে বোঝা যেতো না। রাতভর রঙ্গলীলা শেষে সবাই রিসোর্ট ত্যাগ করতো। এমপি আনারও বিভিন্ন সময় এ রিসোর্টে গিয়েছিলেন। ৭-৮ মাস আগে সেই রিসোর্টে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন আনার। সেখানে দুইজনের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হয়। এর কয়েকমাস আগেও দুইজন ওই রিসোর্টে মিলিত হন। রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় প্রায় ২০ মিনিট দুইজনের কথা হয় বলে আনারের ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন।

মূলত অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে এমপি আনারের সঙ্গে আকতারুজ্জামান শাহীনের সক্ষতা বাড়ে। দুইজন মিলে পরিচালনা করতেন স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডিসহ অবৈধ সব ব্যবসা। এয়ারপোর্ট থেকে স্বর্ণ গ্রহণ করে ভারতের সীমান্ত পার করে দেয়া পর্যন্ত দায়িত্ব ছিল এমপির। বাকি কাজ শাহীন করতো। কিন্তু বছর দুয়েক আগে প্রায় ২০০ কোটি টাকার একটি চালান নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় বলে আলোচনা রয়েছে। যেটি ভালোভাবে নিতে পারেনি শাহীন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমাধান করতে চাচ্ছিল শাহীন কিন্তু দুইজনের মধ্যে এটির সমাধান হয়নি।

কালীগঞ্জ সুগার মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম রসূল। যিনি এমপির ব্যবসায়িক পার্টনার। তিনি বলেন, এমপির সঙ্গে শাহীনের কবে থেকে সম্পর্ক ঠিক জানি না। তবে ৭-৮ মাস আসে এমপি শাহীনের রিসোর্টে গিয়েছিলেন। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। গিয়ে আমরা খাবারো পাইনি। শেষে এমপি শাহীনের সঙ্গে কথা বলে চলে এসেছেন। এর কয়েক মাস আগেও এমপি ওই রিসোর্টে গিয়ে শাহীনের সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেছেন।
আলী মনসুর নামে এক ড্রাইভার বলেন, এমপি আনারের অবৈধ ব্যবসা ছিল এটা ওপেন সিক্রেট। অনেক আগ থেকে এ এলাকা দিয়ে অবৈধ সব ব্যবসা পরিচালনা করতেন এমপি। আর তার অবৈধ ব্যবসার পার্টনার ছিল শাহীন।

শাহীনের বড় ভাই ও কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র সাহেদুজ্জামান সেলিম বলেন, আমার ভাই যদি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে তার বিচার হবে। আইনে যে বিচার হবে তা আমরা মেনে নেবো। কিন্তু আমাদের ধারণা সে এর সঙ্গে জড়িত না। এমপি আনারের বড় ভাই মো. এনামুল হক ইমান বলেন, আনার আর শাহীনের পরিচয় ছিল না। মূলত আমার সঙ্গে শাহীনের বড় ভাই সেলিমের (কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র) সম্পর্ক থেকে তাদের পরিচয়। আমিই তাদের পরিচয় করিয়ে দেই। কিন্তু সে আজ আমার ভাইকে হত্যা করেছে। তার দাবি এমপি আনার ও শাহীনের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না। এমনকি তার ছোট ভাই স্বর্ণ চোরাচালান, হুন্ডি, মাদক কারবার ও নারী পাচারের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না। এসব বলে হত্যাকাণ্ডের কারণ ভিন্নখাতে প্রভাবিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শাহীন একজন খুনি। সে টাকার বিনিময়ে এসব কাজ করে। তাকে দিয়ে আনারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ব্যবসায়িক ঝামেলা হলে সেটি দেশেই মিটমাট করার কথা। সেটি কেন ইন্ডিয়াতে করতে হবে। আমার ভাই কলকাতায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ও চিকিৎসা করাতে গিয়েছিল।

এমপি আনারের অনুসারী ও উপজেলার ১নং সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওহিদুজ্জামান অদু বলেন, জনপ্রিয়তাই ক্ষতির কারণ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। এখানে ব্যবসায়িক কোনো ব্যাপার ছিল না। এমপির আরেক অনুসারী আশরাফুল আলম। যিনি কালীগঞ্জ পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, এমপি সাহেব কোনোভাবেই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না। হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে এ নাটক সাজানো হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার দলের কিনা তা তিনি বলতে রাজি হননি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব হোসেন খান। যিনি রাজনীতিতে এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের প্রতিপক্ষ। তিনি বলেন, এমপির জনসমর্থন আছে এলাকায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ তাকে মার্ডার করবে এমন নেতা এ ঝিনাইদহে তৈরি হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থা বলছে ব্যবসায়িক কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তবে আমরা এমন কিছু জানি না। যে কারণেই হোক এমন হত্যাকাণ্ড কাম্য না। আমরা উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে দাবি করবো এ হত্যকাণ্ডের যেন সুষ্ঠু বিচার হয়। তবে তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে আনোয়ারুল আজিম তিনবারের এমপি। এলাকায় তার প্রভাব, অনুসারী ছিল এটা অস্বীকার করা যায় না।