চরমপন্থি নেতা শিমুল যেভাবে হয়ে ওঠেন আমানুল্লাহ

72
Spread the love



ঢাকা অফিস।।


ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে খুন হওয়ার পর প্রকাশ্যে এসেছে খুলনা অঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়ার নাম। যাকে এমপি আনারের ভাড়াটে খুনি বলছে পুলিশ। ঢাকায় গ্রেফতার হওয়ার পর শিমুল ভূঁইয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছেন, তার নাম সৈয়দ আমানুল্লাহ।

এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিমুল ছাড়াও তার পরিবারের আরও তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা হলেন- শিমুলের স্ত্রী সাবিনা মুক্তা, বড় ভাই লাকি ভূঁইয়া ও ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া।

শীর্ষ চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়া কিভাবে হয়ে ওঠেন সৈয়দ আমানুল্লাহ?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ চরমপন্থি সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-জনযুদ্ধ) অন্যতম শীর্ষ নেতা। ভাই শিপলু ভূঁইয়া ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার পর শিমুলের পাসপোর্টে বসিয়ে দেওয়া হয় আমানুল্লাহ নামটি। আমানুল্লাহ নামের পাসপোর্ট ব্যবহার করেই তিনি ভারতে যাওয়া-আসা করতেন।

ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করতে একই ভুয়া নামে জাতীয় পরিচয়পত্রও (এনআইডি) বানিয়ে নেন শিমুল। শিমুল থেকে আমানুল্লাহ হয়ে ওঠা এবং কিভাবে তিনি ভুয়া পাসপোর্ট ও ভুয়া এনআইডি তৈরি করলেন, এগুলোই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এসেছে।

তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বর্তমানে খুলনা জেলা পরিষদের সদস্য আর ভাই শরীফ মোহাম্মদ ভূঁইয়া ওরফে শিপলু ভূঁইয়া ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। খুলনার এই ভূঁইয়া পরিবারের খুনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসী ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে ফুলতলা উপজেলা নকশাল বাহিনীর ঘাঁটি ছিল। তখন নকশাল সদস্যদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে ভূঁইয়া পরিবারের। এ নিয়ে এলাকার সরদার পরিবারের সঙ্গে ভূঁইয়াদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ওই সময়ই মেধাবী শিক্ষার্থী শিমুল ভূঁইয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

দামোদরের বাসিন্দা নাসির উদ্দিন ভূঁইয়ার ছয় ছেলের মধ্যে চতুর্থ ফজল ভূঁইয়া ওরফে শিমুল ভূঁইয়া ওরফে সৈয়দ আমানুল্লাহ। শিমুল ১৯৮৫ সালে দামোদর এমএম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এরপর দৌলতপুরের দিবা-নৈশ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হন রাজশাহী বিদ্যালয়ে।

তৎকালীন সময়েই স্থানীয় ডুমুরিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান ইমরানকে হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন শিমুল ভূঁইয়া। রাজশাহীতে থাকাকালে ১৯৯১ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে সাত বছর কারাভোগ করেন তিনি। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন কারাগারে। তার কারান্তরীণ অবস্থায় সরদার পরিবারের প্রবীণ সদস্য সরদার আবুল কাশেম দামোদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দুই পরিবারের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও চরম রূপ নেয়।

একপর্যায়ে ১৯৯৮ সালে সরদার আবুল কাশেমকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ বিরোধে প্রবেশ করে অস্ত্রের রাজনীতি। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে খুন হন আবুল কাশেমের বড় ছেলে দামোদরের ইউপি চেয়ারম্যান সরদার আবু সাঈদ বাদলও।

সরদার পরিবারের অভিযোগ, এ দুটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভূঁইয়া পরিবার জড়িত। কাশেম হত্যা মামলায় ভূঁইয়া পরিবারের শিমুল, শিপলু ও মমিনুরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। পরে ২০০০ সালে যশোরের অভয়নগর এলাকায় অন্য একটি হত্যা মামলায় ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জেল খাটেন শিমুল ভূঁইয়া।

পুলিশ জানিয়েছে, বাদল হত্যা মামলাটির বিচার চলাকালে শিমুলের সেজো ভাই মুকুল ভূঁইয়া ওরফে হাতকাটা মুকুল পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন। এর পেছনে স্থানীয় বিএনপি নেতা সরদার আলাউদ্দিন মিঠুর যোগসাজশ থাকতে পারে বলে মনে করে ভূঁইয়া পরিবার। ২০১৭ সালে জেলে অবস্থান করেই ফুলতলা উপজেলার নির্বাচিত চেয়ারম্যান মিঠুকেও হত্যা করেন শিমুল। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের এক আত্মীয় (পুলিশ কর্মকর্তা) খুলনা থেকে যশোর গিয়ে শিমুলকে খুলনায় নিয়ে আসেন। অন্যথায় ওই সময়ই ক্রসফায়ারে পড়তে হতো শিমুলকেও।

এলাকাবাসী জানান, রাজশাহীতে থাকাকালীন শিমুলের যাতায়াত ছিল ঝিনাইদহে। সেখানে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-জনযুদ্ধ) শীর্ষ নেতা আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপনের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শিমুলের ছোট ভাই শিপলু ভূঁইয়া চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর শিমুলের পাসপোর্ট আমানুল্লাহ নামে করে দেন, যা নিয়ে শিমুল ভারতে যাতায়াত করে আসছিলেন। সবশেষ এমপি আনারকে হত্যার জন্য গত ৩০ এপ্রিল বেনাপোল দিয়ে অবৈধপথে সীমান্ত পার হয়ে কলকাতায় যান তিনি।