মোঃ আশফিকুর রহমান।।
পৃথিবীর ইতিহাসে নানা সভ্যতা ও তাদের সম্রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে আমরা নানা ধরনা পাই। তারা তাদের সম্রাজ্যকে কিভাবে বৃদ্ধি করবে, কত সৈন্য তাদের সেনাদলে থাকবে কত রাজ্য তারা দখল করলো, এগুলো ছিলো অনেক সম্রাজ্যের মূল লক্ষ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে আমরা তাদের কে ভুলে গেছি যদিও এমন কিছু সভ্যতার বিকাশ পৃথিবীতে হয়েছে যারা এখনো প্রাসঙ্গিক! কারণ তারা শুধু সম্রাজ্য বৃদ্ধিতে নয় জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ও তার ব্যবহারে অনেক মনোনিবেশ থেকেছে। যেমন গ্রিক সভ্যতা, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন চর্চা উদ্ভব ও বিকাশ, পৃথিবীর শিক্ষা থেকে শুরু করে জীবন ব্যবস্থায় এখনো বিদ্যমান, এইকারণে এই সভ্যতার গুরত্ব এখনো বর্তমান।
বর্তমান পৃথিবীতেও আমরা দেখতে পাই, যে দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষায় যত উন্নত সেই দেশ ততবেশি উন্নত ও শক্তিশালী। যেমন আমেরিকার কথাই ধরা যাক, তারা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন ভাবে তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে যে সারা পৃথিবী থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে প্রতিবছর। নানা উদ্ভাবনী শক্তি ও বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে তারা পৃথিবীকে এক প্রকার তাদের উপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। বর্তমানে পৃথিবীর অনেকদেশ এটা অনুধাবন করেছে যে শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া পৃথিবীতে রাজ করা সম্ভব নয়। তাইতো আমরা দেখতে পাই শিক্ষার উন্নয়নের জন্য পৃথিবীর নানাদেশ নানা রকম মেগা প্রকল্প নিয়ে হাজির হচ্ছে। সামান্য আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথাই ধরুন তাদের শিক্ষাকে উন্নত করার জন্য নান বিধ প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিসহ গবেষণার ফান্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে। যার ফলশ্রুতিতে তাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়র্ যাংকিং ভালো করছে।
আর চায়নার উদাহরণ তো পৃথিবীর মধ্যে নজিরবিহীন , তারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কে শুধুর্ যাংকিং-এ প্রথম দিকে নিয়ে গিয়েছে শুধু নয়, সাইনটিফিক পাব্লিকেশনে তারা আমেরিকাকেউ ছাড়িয়ে গেছে। হংকং এর মত ছোট্ট একটা দেশ তাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কে পৃথিবীর সেরা একশো এর মধ্যে রাখতে সমর্থ হয়েছে। যে সৌদি আরব এর নাম শুনলে আমাদের চোখে একটা অসভ্য সমাজ ব্যবস্থা, অশিক্ষা ও অহংকারী জাতির ছবি ভেসে ওঠে তারাও বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে তাদের শিক্ষাকে উন্নত করতে। মোটা অংকের বেতন দিয়ে তারা বিদেশি ফ্যাকাল্টি নিয়োগ থেকে শুরু করে গবেষণায় প্রচুর বিনিয়োগ করছে।
পৃথিবীতে হয়তো একটা দেশ আছে যারা শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে উন্নত হওয়ার চেষ্টা করছে। আর সেই দেশটা হচ্ছে বাংলাদেশ। কারণ এই দেশ পৃথিবী তো বটেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সব থেকে কম ব্যয় করে শিক্ষা খাতে। শিক্ষার জন্য নেই কোন যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ। জিডিপি এবং বাজেটে তো বটেই সম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি এডিপি থেকেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য অর্থ কমানো হয়েছে। প্রাইমারি ও মধ্যমিক শিক্ষা একটা গিনিপিগে পরিনত হয়েছে।
আজকে আমার লেখার মূল বিষয় উচ্চ শিক্ষা, তাই এই শিক্ষা নিয়ে দু’চার কথা বলবো, কারণ আমি এই শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন মানুষ। পৃথিবীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব হয়েছে জ্ঞান সৃষ্টি করে তার সামাজিক প্রয়োগ করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের সাথে একটা বিশ্বায়নের ব্যাপার আছে। কিন্তু আমাদের দেশে মুড়িমুড়কির মত দেশের আনাচে কানাচে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা ছাড়াই। শিক্ষকদের নেই কোন সুযোগ সুবিধা, নেই ভালো বেতন, নেই গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড। তারপরও মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম পচ্ছন্দ থাকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু বর্তমানে সরকার যে কি বুঝে কাদের পরামর্শে পেনশন সুবিধা শুধুমাত্র সরকারি চাকুরীজীবী বিশেষ করে আমলাদের জন্য রেখে সবার থেকে উঠিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বোধগম্য হলো না। নাম দেওয়া হয়ছে “সর্বজনীন” প্রকল্প কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কে বাদ দিয়ে বিশেষ কিছু সংস্থার মানুষদের জন্য কার্যকর করা হচ্ছে, তাহলে এটা কিভাবে “সর্বজনীন” হলো ! আমি আমলাদের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে নয়, কারণ একটা দেশ পরিচালনার জন্য দক্ষ আমলা আমাদের দরকার। কারণ দেশের কূটনীতি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নানাবিধ কাজে তারা নিয়োজিত। তাই বলে দেশের শিক্ষাখাতে নিয়োজিত শিক্ষক সমাজকে বঞ্চিত করে এহেন বৈষম্যপূর্ণ পরিকল্পনা সমর্থন করা যায় না। এবং এটা দৃশ্যমানভাবেই সমাজে একটা বৈষম্য তৈরি করবে।
শিক্ষক হওয়ার সুবাদে প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থীর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়, এবং এটা একটা স্বস্তির জায়গা যে যারা ক্লাসে টপার হচ্ছে তাদের ৯০% এর এখনো প্রথম পচ্ছন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া অথবা দেশের বাইরে চলে যাওয়া। যারা শিক্ষক হতে পারছেন তারা দেশে থাকছেন আর একটা বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে চিরকালের জন্য। ফিরে আসার মত কোন পরিবেশ যেহেতু আমাদের দেশে নেই সেহেতু তারা আর ফিরে আসার পরিকল্পনা করছে না। সরকার যদি উচ্চশিক্ষা নিয়ে একটু চিন্তিত থাকতো তাহলে এই মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার ও দেশে রাখার ব্যবস্থা করতো।
আর বিসিএস দিয়ে যারা আমলা হচ্ছে তাদের অনেকেই ঐ ৯০% এর মধ্যে থেকে নয়, তাই আমরা মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকেউ এই রেস থেকে হারিয়ে ফেলেছি। যার দরুন আমারা দেখতে পাই মেধাবী বা চৌকস আমলাও কিন্তু তৈরি হচ্ছে না। মাঝে এরকমই একটা লেখা চোখে পড়েছিলো দক্ষ-মেধাবী ও চৌকস আমলাও মন্ত্রণালয়গুলো পাচ্ছে না। কিন্তু তাদের জন্যই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা তাদের জন্য। গাড়ি-বাড়ি থেকে সুপার গ্রেড, ভিআইপি, ভিভিআইপি, আলাদা পাসপোর্টের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছি, কিন্তু ফলশ্রুতিতে আমরা কি সেই মানের সেবা তাদের থেকে পাচ্ছি, পাচ্ছি না। তারা নানাবিধ দুর্নীতিতে জড়িত, বেগম পাড়া, সেকেন্ড হোম সবই এখন প্রকাশিত সত্য। সরকারি প্রতিষ্টানগুলোতে দুর্নিতীর ব্যাপকতা ভয়াবহ রূপধারণ করেছে। সাধারণ সেবা গ্রহীতাদের কে হয়রানি থেকে শুরু করে ঘুষ দুর্নিতী এটা একেবারেই প্রকাশ্য। আমরা ইতিহাসে দেখেছি আইয়ুব খানের শাসনামলে দেশ আমলানির্ভর ছিলো বাংলাদেশে সেই পরিবেশ যে আবার ফিরে এসেছে, তা বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তাতেই প্রকাশ পেয়েছে, দেশ কিন্তু তখন টেঁকসই ছিলো না! আমরা মিডিয়াতে দেখতে পাই।
এখন আসি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। হ্যাঁ এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানবিধ সমস্যা যেমন-লিংক-লবিং থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু নিয়োগ হচ্ছে কিন্তু সবটাই নয়, বড় অংশই নিয়োগ পাচ্ছে মেধার বিচারে। মান্ধাতা আমলের নিয়োগ ব্যবস্থা আর বেতন কাঠামো এই সেক্টরে নিয়োজিত শিক্ষকদের চরম হতাশায় নিয়ে গেছে। যথাযথ ফান্ডের অভাবে গবেষণাও তেমন আগাচ্ছে না। কিন্তু তারপরেও এই সেক্টর মেধাবী শিক্ষার্থীদের এখনো প্রথম পচ্ছন্দ। এই সেক্টর কে ঢেলে না সাজালে অদূর ভবিষতে আমরা শুধু আমলা দেখবো, কোন শিক্ষক, গবেষক দেখবো না। যেখানে সারা পৃথিবীতে শিক্ষাখাতকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, সেখানে আমরা কেনো ব্যাতিক্রম হবো! আমলাদের জন্য তো সবকিছু করেছেন এবার রাষ্ট্রের শিক্ষকদের জন্য করুন দেখবেন দেশ এমনি এমনিই স্মার্ট হয়ে যাবে। কারণ মেধা ও প্রজ্ঞা-সম্পন্ন সৎ-নাগরিক গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
অনতিবিলম্বে নতুন পেনশন ব্যবস্থার নামে যে বৈষম্য তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে সেটা বাতিল করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটা সার্চকমিটি তৈরি করুন এবং পিএইচডি-কে বাধ্যতামূলক করুন প্রাথমিক নিয়োগের জন্য। পোস্ট-ডক থাকলে বাড়তি সুবিধা প্রদান করুন। পারিতোষিকের মত অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার বিলোপ করে, শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ঘোষণাসহ সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করুন। আনাচে কানাচে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প থেকে সরে এসে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত ফান্ডের পাশাপাশি আধুনিকায়ন করুন। উচ্চশিক্ষায় মেগা প্রকল্প গ্রহণ করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য শুনি ইউজিসি আছে কিন্তু তারা শিক্ষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু করেছে বলে আমার মনে হয় না, সরকারের সাথে দেনদরবার করে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষকদের বেতন সুবিধা বৃদ্ধি করা এমন কি, গবেষণার ফান্ড বৃদ্ধিরও কোন কাজ করেছে বলে দৃষ্টিতে আসে না। এই যে পেনশন সুবিধা বাতিল করা হলো এনিয়ে তাদের কোন বক্তব্য চোখে পড়ে নি, এখন পর্যন্ত। পড়ারও কথা নয় কারণ সরকারের সাথে দেনদরবার করার মত অবস্থানে তারা কি আছে? কারণ সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েই তারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাইতো কিছু ট্রেনিং আর প্রজেক্ট করা ছাড়া তাদের কোন কাজ নেই।
টেঁকসই আলোকিত সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে শিক্ষা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার সময়ের দাবী নয় এটা আবশ্যক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও সমৃদ্ধ, নৈতিকতাবোধসম্পন্ন, সৎ, ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ার নিমিত্তে শিক্ষা সেক্টরে মেধাবীদের আকৃষ্ট করা যখন সবার দাবী সেখানে এহেন বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ কার স্বার্থে কাদের পরামর্শে নেওয়া হলো বোধগম্য নয়। যখন দেশ একটা স্থিতিশীল অবস্থার মধ্যদিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন এইধরনের পদক্ষেপ শিক্ষকসমাজ থেকে শুরু করে এই প্রকল্পের ব্যাপ্তির মধ্যে যারা আসবে সেই সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে চরম হতাশা ও অস্থিশীলতা তৈরি করবে স্বাভাবিক। সুতরাং সরকারের প্রতি বিনীত কামনা, এহেন বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ থেকে সরে আসুন, না হলে যেহেতু নাম দেওয়া হয়েছে “সর্বজনীন” সেহেতু সবার জন্য কার্যকর করুন। লেখক- সহকারী অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়











































