কলমানি-কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার বাড়ছে ব্যাংকের

4
Spread the love

ঢাকা অফিস।।

রোজার ঈদকে সামনে রেখে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলার চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এতে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তঃব্যাংক কলমানি থেকে ধার বাড়িয়েছে। গতকাল একদিনের ব্যবধানে কলমানিতে লেনদেন বেড়েছে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। আন্তঃব্যাংক কলমানির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ ধার করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। এর মধ্যে গত সোমবার একদিনে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে ২৫ কোটি টাকার বেশি তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ধারের টাকায় গ্রাহক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ করছে ব্যাংকগুলো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। আবার কেন্দ্রীয়

ব্যাংক থেকে ডলার বিক্রি অব্যাহত থাকায় বাজার থেকে নগদ টাকা উঠে আসছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া বিতরণ করা ঋণ আদায় না হওয়া ও খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। ফলে এমনিতেই নগদ টাকার টানাটানির মধ্যে আছে বেশির ভাগ ব্যাংক। আর এখন ঈদ সামনে ব্যক্তি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সব ধরনের গ্রাহকরা নগদ টাকার চাহিদা বেশি করছেন। আর গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো এক প্রকার হিমশিম খাচ্ছে। আন্তঃব্যাংক কলমানি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার বাড়িয়েও এই সংকট কাটছে না অনেকের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, রোজা ও ঈদের সময় নগদ টাকার বেশি চাহিদা হয়। এ সময়ে মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে খরচের জন্য তুলে নিয়ে যায়। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকও বাজারে টাকার সার্কুলেশন কিছুটা বাড়িয়ে রাখে। তবে সব ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা একই রকম না হওয়ায় তোলার প্রবণতা বাড়লে তারা সংকটে পড়ে যায়। তখন সংকট কাটাতে প্রথমে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে টাকা ধারের চেষ্টা করে। সেখানে না পেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং তারল্য সংকট একদিনে হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা লুটপাটের কারণে ব্যাংক থেকে যেসব অর্থ বেরিয়েছে সেগুলো ফেরত আসছে না। খেলাপি ঋণ বাড়ায় এর বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে চড়া মূল্যস্ফীতি ও আস্থার সংকটে অনেকে ব্যাংকে টাকা রাখছে না। একটি শ্রেণি বিদেশেও টাকা পাচার করে দিচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোও তারল্য ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে করতে পারছে না।

নগদ অর্থের সংকট দেখা দিলে একদিনের জন্য এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়, যা আন্তঃব্যাংক কলমানি নামে পরিচিত। রোজা শুরুর পর থেকে এ বাজারে গড় সুদের হার একটু একটু করে বাড়ছে। যদিও সর্বোচ্চ সুদের হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে দীর্ঘদিন সাড়ে ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে গড় সুদের হার ওঠানামা করছে প্রতিনিই। যেমন রোজার শুরুতে গত ১৩ মার্চ এই বাজারে গড় সুদের হার ছিল ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত ৩১ মার্চ সেই সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে ওঠে। তবে গত দুই দিনে গড় সুদ কিছুটা কমেছে। তবে গত দুই দিনে এই বাজারে নতুন করে সুদের হার না বাড়লেও লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। গতকাল এই বাজারে গড়ে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ সুদে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়। আগের দিন এই বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আর তার আগের দিন গত ৩১ মার্চ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।

শুধু আন্তঃব্যাংক কলমানিই নয়, ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি অন্যান্য ধারের পরিমাণও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গতকাল ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২ দিন মেয়াদে ধারের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫০ কোটি টাকা, যা আগের দিনও ছিল মাত্র ৫০ কোটি টাকা। ৬ দিন মেয়াদি ধারের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০০ কোটি টাকা, যা আগের দিন ছিল শূন্য। ১৪ দিন মেয়াদি ধারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, যা আগের দিন ছিল

এদিকে নগদ টাকার সংকট মেটাতে প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সোমবার একদিনে দেশের ৪৫টি ব্যাংক ও ৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন মেয়াদে ২৫ হাজার ৬ কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ১ দিন মেয়াদি রেপো সুবিধার আওতায় ৫টি ব্যাংক নিয়েছে ৩ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। ৭ দিন মেয়াদি রেপো সুবিধার আওতায় ২০টি ব্যাংক ও ৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নেয় ৯ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। ১৪ দিন মেয়াদি রেপোর আওতায় ১ ব্যাংক নেয় ৫৩৭ কোটি টাকা। ১ দিন মেয়াদি অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট সুবিধার আওতায় ১৭টি ব্যাংক নেয় ১০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২৮ দিন মেয়াদি ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি সুবিধার আওতায় ২টি ব্যাংক নেয় ৫৭০ কোটি টাকা। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ৮ থেকে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ সুদে এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো সাড়ে চার থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ মুনাফা পরিশোধের শর্তে এই ধার নিয়েছে। তার আগের দিন ৩১ মার্চ ৩৩টি ব্যাংক ও ৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলে ধার নিয়েছিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।