স্ট্যাম্প-কোর্ট ফি’র তীব্র সংকট, সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে সিন্ডিকেট

17
Spread the love

ঢাকা অফিস।।

সুপ্রিমকোর্টসহ সারাদেশের অধস্তন আদালতসমূহে জুডিশিয়াল, নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও’র তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প স্বল্পতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অধিক দাম হাঁকাচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি দামে কোর্ট ফি-স্ট্যাম্প কিনতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।

উচ্চ দামে জুডিশিয়াল, নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি কিনতে হওয়ায় ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থীদের মামলার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে মামলার বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা বলছেন, আদালত প্রাঙ্গনে অনেক ভেন্ডারের কাছে কোর্ট ফি স্ট্যাম্প পাওয়া যাচ্ছে না তবে বেশী টাকা দিলে ঠিকই মেলে। এভাবে বেশি দামে কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প বিক্রয় করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একদল সিন্ডিকেট।

দেশের আদালতসমূহে স্ট্যাম্পের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও কোর্ট ফি আদালতে দাখিল করতে না পারায় মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, কোর্ট ফি স্ট্যাম্পের সংকটে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে বিচারপ্রার্থীরা।

তিনি আরও বলেন, ‘১০ টাকার কোর্ট ফি ১৩ টাকা কিনতে হচ্ছে। ১শ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ১শ’ ২৫ থেকে ১শ’ ৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে ১৫০ টাকাও বিক্রি হচ্ছে শোনা যায়। পাঁচশ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ৭শত থেকে ৮শত টাকা কিনতে হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ মোকদ্দমা, পারিবারিক মোকদ্দমা, সাকসেশন মোকদ্দমায় ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে কোর্ট ফি কিনতে হয়। কিন্তু ট্রেজারিতে টাকা জমা দিয়েও কোর্ট ফি মিলছে না। এতে করে মামলার কার্যক্রম বিলম্ব হচ্ছে।’

ঢাকা জজ কোর্টের স্ট্যাম্প ভেন্ডার লক্ষ্মীনাথ বলেন, ‘ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে আড়াই মাসেও কোর্ট ফি পাওয়া যাচ্ছে না। গত ২১ জুলাই ট্রেজারির চালানের মাধ্যমে স্ট্যাম্প কেনার জন্য টাকা জমা দেয়। কিন্তু ওই চালান পেতে পেতে গত ১০ সেপ্টেম্বর হাতে পেলাম। আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা। দীর্ঘদিন টাকা জমা থাকলে কীভাবে চলবে ব্যবসা। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশি থাকে কিনেছি, এ জন্য একটু বেশি দামে বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছি।’

ঢাকা জজ কোর্টের স্ট্যাম্প ভেন্ডার মহাসিন মিয়া বলেন, ‘কোর্ট ফি, স্ট্যাম্পের দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলছে। এখানে কোনো প্রকার সিন্ডিকেট নেই। গ্রাহকদের চাহিদা মেটানোর জন্য বেশি দামে স্ট্যাম্প কিনতে হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে বিক্রয়ের সময় দাম বেশি মনে হচ্ছে। আমাদের সেই আগের মতোই ৫/১০ টাকা লাভ থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোর্টি ফি, স্ট্যাম্প সরবরাহ বেশি হলে দাম আগের মতো হয়ে যাবে। আমরা কম টাকায় কিনতে পারলে বেশি দাম বিক্রয় করব কেন।’

বাংলাদেশ স্ট্যাম্প ভেন্ডর সমিতির মহাসচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কাগজের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় নাকি স্ট্যাম্প ছাপানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশ থেকে কাগজ আনার পর এটি গাজীপুর সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে ছাপা হয়। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে তা সারাদেশের ট্রেজারিতে পাঠানো হয়। ভেন্ডাররা ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে চালান ট্রেজারিতে জমা দিলে ট্রেজারি শাখা ভেন্ডরদের স্ট্যাম্প সরবরাহ করে। আশা করি, কিছুদিনের মধ্যে এর সমাধান আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার আদালতে একটি একশ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ১২০ থেকে ১৩০ টাকা ও ১০ টাকার স্ট্যাম্প ১৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে এ সংকট আরও তীব্র। কোন কোন স্থানে এটি একশ টাকার স্ট্যাম্প দেড়শ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে বলে শোনা যায়।’

এদিকে কোর্ট ফি,স্ট্যাম্পের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গভর্নরকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার (বিচার) এস কে.এম. তোফায়েল হাসান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বরাবর এ চিঠি দেন।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ অন্যতম বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ এবং দেশের ৬৪টি জেলার অধস্তন আদালতে প্রতি কার্যদিবসে বিচারপ্রার্থী জনগণের পক্ষে মামলা দায়েরসহ অন্যান্য দরখাস্ত দাখিলের সময় জুডিসিয়াল ও নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সংযুক্ত করতে হয়। আদালতে দাখিলকৃত স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি’র মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। জুডিসিয়াল ও নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প জালিয়াতির কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

নকল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি শনাক্তকরণের নির্মিত্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ, সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড (এসপিসিবিএল), ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট ও পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক এর সমন্বয়ে কিছু স্বল্পমেয়াদী ও কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল।

তারই ধারাবাহিকতায় I CD UV LED flash light (UV-365nm) ডিভাইস ব্যবহার করে নকল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সনাক্তকরণের নিমিত্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি/সম্পাদকগণ-কে প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং অধস্তন আদালতে I CD UV LED flash light (UV-365nm) ডিভাইস বিতরণ করে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের গোচরীভূত হয়েছে যে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং দেশের ৬৪টি জেলায় স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও এর সংকট বিরাজ করছে। বিচারপ্রার্থীদের বাধ্য হয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে ভেন্ডারদের কাছ থেকে এ সব কিনতে হচ্ছে। ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

ভেন্ডারদের অভিযোগ, ট্রেজারিতে স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও এর চরম সংকট থাকায় ট্রেজারি শাখা থেকে চাহিদামতো স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও এর সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।

চিঠিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টসহ অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালে স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও এর স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার করতে গভর্নরকে অনুরোধ করা হয়।