তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন # সত্যতার ইঙ্গিত তদন্ত কমিটির
মুুহাম্মদ নূরুজ্জামান:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার রূপসা উপজেলায় কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুনা কান্ত সরকারের বিরুদ্ধে স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে বাগেরহাটের কোটায় চাকরিতে প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি খুলনার দাকোপ উপজেলার গহরখালি গ্রামের বাসিন্দা জনৈক নিমাই চন্দ্র গাইন এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঢাকায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এ ঘটনার তদন্তে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
এদিকে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে চাকরিতে প্রবেশের কয়েক বছর পর জমি ক্রয় করে বাগেরহাটে স্থায়ী ঠিকানার বিষয়টি নিশ্চিতকরণ এবং বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন কৃষি কর্মকর্তা করুনা কান্ত সরকার। অনুসন্ধান ও লিখিত অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, করুনা কান্ত সরকার খুলনার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের গহরখালি গ্রামের (২নং ওয়ার্ড) বাসিন্দা। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তথ্য অনুযায়ী তিনি ১৯৭৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সুধাংশু কুমার সরকার। তিনি ১৯৯৩ সালে দাকোপ উপজেলার চালনার বটবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। যদিও এসএসসি পাশের সনদে তার জন্ম তারিখ ১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে ২০০৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের কোটায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন। তিনি বাগেরহাট পৌরসভার দশানী গ্রামকে স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করে চাকরিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তাকে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগদান করানো হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুনা কান্ত সরকার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে খুলনার দাকোপের পরিবর্তে বাগেরহাটের দশানী গ্রামে মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকারি চাকরি করে আসছেন এবং অবৈধভাবে সরকারি বেতনের টাকা গ্রহণ করে চলেছেন। বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন থাকার পর প্রকাশ পেয়েছে। তার এ দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির খবর দাকোপ উপজেলার গহরখালি গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিষয়টি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত পূর্বক ঠিকানা গোপনকারী ও জালিয়াতির অভিযোগে করুনা কান্ত সরকারের শাস্তি দাবি করা হয়েছে অভিযোগে।
এদিকে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক মোঃ হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অপর দুই সদস্য হলেন রূপসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামান ও দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান। কমিটির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
কমিটির প্রধান জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুনা কান্ত সরকারের জন্ম খুলনার দাকোপ উপজেলার গহরখালি গ্রামে। এসএসসি পাস করেছেন দাকোপের বটবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। কিন্তু ২০০৪ সালে বাগেরহাট পৌর মেয়রের একটি নাগরিক সনদপত্র তিনি জমা দিয়েছেন আর ২০০৬ সালে তিনি চাকরিতে প্রবেশ করে পরবর্তীতে ২০১৭ সালে বাগেরহাটে ৩ শতক জমি কিনেছেন। তার এসব তথ্যে বোঝাই যায়, যে তার স্থায়ী ঠিকানা দাকোপে। যদিও তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে বাগেরহাটে ভাড়াটিয়া ছিলেন বলে দাবি করেছেন। সেক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশকালীন বাগেরহাটে তার স্থায়ী ঠিকানার বিষয়টি প্রমাণ হয়না। এছাড়া তার দেয়া তথ্যে দুর্বলতা পাওয়া যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তদন্ত রিপোর্ট জেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে দাখিল করেছেন বলেও জানান তিনি।
তদন্ত কমিটির সদস্য রুপসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামান বলেন, করুনা কান্ত সরকার রূপসা উপজেলার স্বল্প বাহিরদিয়া ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে স্থায়ী ঠিকানা গোপন সংক্রান্ত অভিযোগ তারা পেয়েছেন এবং বিষয়টি তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। চূড়ান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী উর্ধতন কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। রিপোর্টে বিষয়টি উচ্চতর তদন্ত অথবা অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুনা কান্ত সরকার এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি বাগেরহাট পৌরসভার দশানী গ্রামের ৩নং ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। কিন্তু ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম জানেন না তিনি। বর্তমানে খুলনা মহানগরীর সাউথ সেন্ট্রাল রোড এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তার স্থায়ী ঠিকানা গোপন সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বলেন, তিনি খুলনার দাকোপ উপজেলার গহরখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালের ঝড় জলোচ্ছ্বাসে নদী ভাঙ্গনের কারণে তিনি বাগেরহাটে চলে যান। যদিও তারও পাঁচ বছর পর ১৯৯৩ সালে দাকোপের বটবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশের বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। তবে ভোটার আইডি কার্ডে দাকোপের ঠিকানা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন ও ২০০৪ সালে বাগেরহাট পৌর মেয়রের কাছ থেকে নাগরিক সনদপত্র নিয়েছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি। যদিও ২০০৬ সালে চাকরিতে যোগদানের দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর ২০১৭ সালে বাগেরহাটে জমি কিনেছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কাজী আব্দুল মান্নান বলেন, করুনা কান্ত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি তিনিও শুনেছেন। বিষয়টির তদন্ত চলছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রসঙ্গত, চাকরিতে যোগদানকালীন নিয়োগপত্রের ৩নং কলামের শর্তানুযায়ী, স্থায়ী ঠিকানা সম্পর্কে ভবিষ্যতে কোন প্রকার গড়মিল প্রমাণিত হলে নিয়োগ বাতিল বলে গণ্য হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।











































