সাবজাল হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি ॥

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মাছচাষীদের সংখ্যা অনেক। চাষ করেন দেশী বিদেশী নানা জাতের মাছ। কিন্ত বিদেশে রপ্তানী হওয়া সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির চাষ সম্পর্কে কিছুই বোঝেন না তারা। মৎসচাষীদের ধারনা এ মাছ শুধু লোনা পানিতে ঘেরে উৎপাদন হয়। কিন্ত মিঠা পানির পুকুরে এ সাদা সোনা খ্যাত গলদা চিংড়ির চাষ করে তাদের ভূল ভেঙে দিয়েছেন এক মৎসচাষী স্বপন বিশ্বাস। এ উপজেলাতে তিনিই প্রথম মুল্যবান চিংড়ির চাষ করে সকলের নজর কেড়েছেন। স্বপন বিশ্বাসের বাড়ি উপজেলার সুন্দরপুর দূর্গাপুর ইউনিয়নের মহাদেপপুর গ্রামে। তার সফলতায় এলাকার অনেক মৎসচাষী এখন ঝুঁকছেন গলদা চিংড়িতে।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, স্বপন বিশ্বাস নিজের একটি মধ্যম আয়াতনের পুকুরে গলদার চাষ করেছেন। পুকুরটির পাড় ও জলাকারের অংশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে পানিতেই করা হয়েছে মাছের খাবার দেয়ার বিশেষ স্থান। পুকুরটি পরিচর্যার জন্য সার্বক্ষনিক একজন শ্রমিক কাজ করছেন।

স্বপন বিশ্বাস জানান,নিজে মৎস অফিসের ক্ষেত্র সহকারীর চাকুরী করেন। চাকুরীর সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় তিনি মৎস নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এ সুবাদে দেশের চিংড়ি এলাকা খ্যাত সাতক্ষীরা জেলায় বেশ কয়েক বছর থেকেছেন। সেখানে থেকে মৎস ঘেরে চিংড়ি চাষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেন। পরে বদলী হয়ে এলাকায় এসে নিজ পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন।
তিনি জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে ৬৬ শতক জলাকারের পুকুরের সাতক্ষীরা এলাকা থেকে প্রতি পিচ ১৮ টাকা দরে মোট ৩ হাজার ২’শ গলদা চিংড়ীর রেনু পোনা কিনে পুকুরে ছাড়েন। এতে পরিবহন খরচসহ তার প্রায় ৫৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এরপর ঠিকমত পরিচর্যার ফলে গলদাগুলো বেশ বড় হয়েছে। মাত্র সাড়ে ৭ মাসে এখন ৯ থেকে ১০ টি চিংড়িতে এক কেজি ওজন হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের কাছে প্রতিকেজি ১ হাজার টাকা দরে প্রায় ৬৫ কেজি চিংড়ি বিক্রি করেছেন। সাতক্ষীরা এলাকা থেকে গলদা চিংড়ি যারা বিদেশে রপ্তানীর সাথে জড়িত তারা যোগাযোগ করে আরও বেশি দামের অফার দিয়েছিলেন। কিন্ত করোনা পরিস্থিতির জন্য পরে লেনদেন হয়নি। সফল মাছচাষী স্বপন কুমার আরও জানান, পুকুরে এখনও কমপক্ষে ২’শ থেকে আড়াইশ কেজি চিংড়ি রয়েছে। এছাড়াও ওই পুকুরে বড় বড় আকারে প্রায় লক্ষাধিক টাকার কার্পজাতীয় মাছও আছে। এদিকে ওই পুকুরে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্ত সব মাছ বিক্রি করলে যাবতীয় খরচ বাদেই তার ২ লক্ষাধিক টাকা লাভ আসবে।

স্বপন কুমার আরও জানান, এ এলাকার অনেক মানুষ মাছ চাষের সাথে জড়িত। কিন্ত কিভাবে চিংড়ির চাষ করতে হয় তা তারা জানেন না। অথচ নিজে চিংড়ি চাষ করে দেখলাম এ চাষে অধিক লাভ করা যায়। সাধারনত বেলে দোআঁশ মাটির পুকুরে ২ থেকে আড়াই মিটার পানি থাকলেই চলে। নিয়মিত খাবারের যোগান ও ঠিকমত পরিচর্যা করা লাগে। তবে চিংড়ি মাছ পানিতে রাতের বেলায় চলাচল বেশি করে। এ সময়ে পুকুরের কুলে বা ডাঙ্গায় এসে চিংড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে রাতের বেলায় এ মাছ ধরা খুবই সহজ। এ কারনে মাছ রক্ষায় পাহারা দিতে হয়। এছাড়াও সব সময় পানিতে এ্যামোনিয়া গ্যাস আর অক্সিজেন ঠিক রাখতে হয়।
স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, চাকুরীর জন্য যথেষ্ঠ সময় পান না। ফিসারিজের উপর চার বছরের ডিপ্লোমা করে মাছ চাষ সম্পর্কে কিছুটা জানতে পেরেছেন। যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা এখন বেশ কাজে লেগেছে। একজন শ্রমিকের সাথে মাছের পুকুরটি ছেলেই বেশি দেখাশুনাকরেন। নিজে অফিস থেকে ফিরে শুধু ব্যবস্থাপনায় কাজ করেন।
মৎসচাষী আব্দুস সবুর অশোক জানান, তাদের পূর্ব পুরুষেরা মাছ চাষের সাতে জড়িত ছিলেন। এখনও তিনি মোট ১২ টি পুকুরে কার্প জাতীয় মাছ চাষ করছেন। কিন্ত চিংড়ির চাষ কোন দিন করেননি। তারা জানতেন এ মাছ ঘেরে লোনা পানিতে ছাড়া হয়না। কিন্ত এলাকার স্বপন বিশ্বাস পুকুরে চাষ করে সফল হয়েছেন। তিনিও আগামীতে একটি পুকুরে গলদার চাষ করবেন বলে ভাবছেন।
একই কথা বললেন, মাছচাষী আব্দুল মান্নান মনা। তিনি বলেন, স্বপনের পুকুরের গলদা তিনি নিজে দেখেছেন। তার ৫ টি পকুরে কার্প জাতীয় মাছে যে পরিমান পয়সা লাভ হবে চিংড়ির যে দাম সে হিসেবে স্বপনের এক পুকুরেই তার চেয়ে বেশি লাভ আসবে। গলদা চাষের জন্য তিনি নিজেও একটি জলাশয় প্রস্তত করছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলার সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ সাইদুর রহমান রেজা জানান, এ এলাকার মাছ চাষীরা গলদা চিংড়ি চাষে একেবারেই আগ্রহী নন। তারা এটা বুঝেনও না। তবে বাজারে এ মাছের দাম অনেক। রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়ে থাকে। এ জেলার আবহাওয়া এবং পানি গলদা চাষের জন্য উপযুক্ত। স্বপন বিশ্বাসের গলদা চিংড়ি চাষ সকলকে উৎসাহিত করেছে। এখন অনেকে যোগাযোগ করছেন গলদা চাষ করবেন বলে। তিনি বলেন, কালীগঞ্জ মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে স্বপন বিশ্বাসের সার্বিক সহযোগীতা করা হয়েছে।











































