গানের মানুষ প্রাণের মানুষ

1
Spread the love

নাজমুল হক লাকি

একটি গান-একটি হৃদয় তোলপাড় করা কবিতা। একটি গান-অনেক না বলা কথায় সাজানো একটি ছোট গল্প। একটি গান-জীবন থেকে নেয়া একটি উপন্যাস। স্বপ্ন-কল্পনা আর বাস্তবতা যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। গানই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় নানা সময়ের নানা রঙের অনুভূতির কাছে। ফিকে হয়ে আসা স্মৃতির জীবন্ত হয়ে ওঠার গল্পগুলো যেখানে এসে ডানা মেলে। গীতিকার, সুরকারের পাশাপাশি একটি গানকে শ্রোতার কাছে পরিবেশনযোগ্য, আকর্ষণীয় এবং হদয়গ্রাহী করে তোলেন একজন দক্ষ রিদমিস্ট। বাংলাদেশের দুই-তিনজন রিদমিস্টের নাম উল্লেখ করলে সেখানে অবধারিতভাবেই এসে যায় হাজী বাবুর নাম। পুরো নাম জাহিদ হাসান বাবু। আজ ২৩ জুলাই হাজী বাবুর জন্মদিন। তাঁকে ঘিরেই আমাদের আজকের এ আয়োজন-গানের মানুষ প্রাণের মানুষ। তাঁর সাথে কথা বলে তাঁর সঙ্গীত জীবনের বিভিন্ন বিষয় তুলে এনেছেন নাজমুল হক লাকি।

দক্ষ গিটার বাদক হওয়ায় গানে হারমোনিক ডেপথ্ এর গুরুত্বটা সহজেই হয়তো বুঝেছিলেন হাজী বাবু। ফলে তাঁর কম্পোজিশনে তৈরি গানের চেহারাই পাল্টে যায়। গিটার, ড্রাম আর বংগোর জমজমাট সঙ্গতে তাঁর প্রতিটি গানই যেন ভরে ওঠে যৌবনের উচ্ছলতায়। যখন সুর করেন তাঁর সুরে খেলা করে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণ। অনেক গানেই প্রাচ্যের সুরে ওয়েস্টার্ন রিদমের ব্যবহার করেছেন তিনি। কোন কোন গানে ক্যারিবিয়ান ও আফ্রিকান রিদমের সঙ্গে আমাদের দেশীয় ব্যান্ডপার্টির ট্রাম্পেট ও খঞ্জনির বাদন মিশিয়ে দেন, ফলে গানটি শ্রোতার কাছে হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।

খুলনায় পারিবারিক সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ব্যবসায়ী বাবা ছিলেন সংস্কৃতি অন্ত:প্রাণ। সঙ্গীত জগতে কিভাবে প্রবেশ জানতে চাইলে বললেন, ‘বড় ভাই জিয়াউল হাসান পিয়াল তখন টুটপাড়ার ব্রাইট স্টার অর্কেস্টা ব্যান্ড দলের সদস্য। প্র্যাকটিস হতো ওস্তাদ শামছুদ্দিন স্যারের বাসায়। বড় ভাই এর সাথে প্রায়ই আমি সেখানে যেতাম। তখন তারা নতুন ড্রামস কিনেছে। বিখ্যাত ড্রামার তোজো ভাই ড্রামস বাজাচ্ছেন। কেউ গিটারে সুর তুলছেন, কেউ গান গাচ্ছেন! কী অদ্ভুত সুরের মায়া জড়ানো পরিবেশ! এসব দেখে দেখে নিজের অজান্তেই ঢুকে পড়েছি সুরের ভুবনে। আমার আগ্রহ দেখে বড় ভাই আমাকে গিটার বাজানো শিখিয়ে দিলেন। তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। ১৯৮৯-৯০ এই দুই বছর আমি ভাইয়ার কাছে গিটার শিখি। বাসায় বসেই দিনরাত প্র্যাকটিস করতাম।’

গিটার বাজাতে বাজাতে নিজেই ড্রামস বাজানো শিখে গেলেন। বড় ভাই তাঁকে শুধু একটা বিট শিখিয়ে দেন, ফোর বিট। স্কুলে পড়া অবস্থাতেই তিনি গিটার এবং ড্রামস বাজাতে পারতেন। কলেজে উঠেই খুলনার বিভিন্ন স্টেজ শোতে পারফর্ম করা শুরু করেন। এরমধ্যেই বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুললেন কয়্যারস ওয়ার্ল্ড ব্যান্ড। তিনি ছাড়াও দলের অন্যান্য সদস্য ছিলেন তাজ ভাই, সঞ্জয় বাড়ই, আজমীর বাবু। গান গাইতেন মিজান, আতাহার টিটো-সবাই তাঁর বন্ধু। দুই-তিন বছর খুলনার বিভিন্ন স্থানে প্রোগ্রাম করেছেন। ১৯৯৩ সালে বড় পরিসরে পপ স¤্রাট আজম খানের সাথে বাজানোর সুযোগ পান। আইয়ুব বাচ্চু, জেমসসহ বড় বড় স্টারদের সাথে সেসময় তিনি ড্রামস অথবা গিটার বাজিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে যোগ দেন ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডে। বড় ভাই জিয়াউল হাসান পিয়াল তখন ঢাকায় স্থায়ী হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তাঁকেও নিয়ে যান ঢাকা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

জাহিদ হাসান বাবুর বাড়ি খুলনার হাজী মহসিন রোডে। করোনার কারণে দীর্ঘদিন অবস্থান করছেন খুলনায়। প্রফেশনাল মিউজিশিয়ান, যেখানেই যান কাজ ছাড়া থাকতে পারেন না। খুলনা থেকেই বিভিন্ন গানের রিদম প্রোগ্রামিং করে ই-মেইলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ঢাকায়। দুদিন আগে গিয়েছিলাম হাজী মহসিন রোডে। তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। বাবুর সাথে অনেকদিন দেখা হয় না। ফোন করতেই চলে এলেন। আর কেউ নেই। দুজনে বসে গেলাম আড্ডায়। শুনতে চেয়েছিলাম বাবুর সঙ্গীত জীবনের কথা।

আবারও শুরু করলেন। কোন রাখঢাক ছাড়াই বলে চললেন ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, ‘১৯৯৯ সালটা আমার জীবনের টার্ণিং পয়েন্ট। একদিন প্রিন্স মাহমুদ ভাই আমাকে ডেকে বললেন-‘তুই আমার গানে প্রোগ্রামিং কর। আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেলাম। তখন থেকেই বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের লিজেন্ড আজম খান, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, মাকসুদ ভাইসহ প্রায় সবার গানে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাই। তখনকার উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম ষোল গুটি; হাসানের প্রথম সলো অ্যালবাম তাল; জেমস, আইয়ুব বাচ্চু ও হাসানের সুন্দরী; আজম খান, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, পার্থ বড়–য়ার সাত রঙের কষ্ট; আজম খান, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, শাফিন ভাই, মাকসুদ ভাই ও পার্থ বড়–য়ার মেহেদী রাঙা হাত; কুমার বিশ^জিতের কাগজের ফুল। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার গানের রিদম প্রোগ্রামিং করেছি।’

সিনেমায় কাজ করেছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘সিনেমায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গানের রিদম প্রোগ্রামিং করেছি। কম্পোজিশন করেছি। ১৯৯৯ সালেই শুরু। একদিন শ্রদ্ধেয় আলাউদ্দিন আলী আমাকে ডেকে পাঠালেন শ্রুতি স্টুডিওতে। বিকেল তিনটা হবে। তখনই আমি রিদম বক্সটা নিয়ে চলে গেলাম। ওখানে গিয়ে দেখি অনেক বিখ্যাত মিউজিশিয়ান বসা। মাঝখানে বসে আছেন সিনেমার পরিচালক স্বয়ং আমজাদ হোসেন। নায়ক-নায়িকার বিভিন্ন মুভমেন্টের তাল, সেইসাথে কোথায় কোন মিউজিক হবে সেটা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন আলাউদ্দিন আলী। সিনেমার মত বড় মাধ্যমে এটাই আমার প্রথম কাজ। রেকর্ডিং শেষে বড় সাউন্ড বক্সে যখন বাজানো হলো, আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। প্রথমে কিছুটা ভয় কাজ করলেও সাউন্ড শোনার পর আত্মবিশ^াস ফিরে পেলাম। ওইদিনই পরপর চারটা সিডিউল আমাকে দিয়ে দিলেন আলাউদ্দিন আলী। সিনেমার নায়ক ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। হিন্দী ভার্সনেও আমাদের মিউজিকেই কাজ করেছিলেন মিউজিক ডিরেক্টর। এরপর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সমর দাশ, প্রণব ঘোষসহ অনেক দেশবরেণ্য মিউজিক ডিরেক্টরের সাথে কাজ করেছি। এখনও আজাদ মিন্টু, বদরুল আলম বকুল,ইমন সাহা, শওকত আলী ইমনের সাথে কাজ করছি। আমি নিজেই একটি সিনেমার মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছি। সিনেমার নাম-সেদিন বৃষ্টি ছিল।’

সনু নিগমের পূবাল হাওয়া সলো অ্যালবামের কাজ করেছেন হাজী বাবু। আটটি গানের এই অ্যালবামের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন খুলনার দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সনু নিগমের এই কাজটিই ছিল দেশের বাইরে তাঁর প্রথম কাজ। ২০০৪ সাল। বর্তমান সময়ের বিখ্যাত মিউজিক ডিরেক্টর মুশফিক লিটু, হাজী বাবু ও মাসুদ-এই তিন বন্ধু মিলে গড়ে তোলেন নিজস্ব মিউজিক স্টুডিও। মুশফিক লিটু কম্পিউটারে মিউজিক কম্পোজিশনে দক্ষ নাবিকের মত। গানে সুরের নানা বৈচিত্র্য ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মুশফিক লিটু ও হাজী বাবু নিরন্তর গবেষণা চালাতে থাকেন। মুশফিক লিটুই বাবুকে শিখিয়ে দেন কম্পিউটারে মিউজিক কম্পোজ করা। এরপর বাবু ক্লোজ আপ ওয়ানের ট্র্যাক রাউন্ডগুলোতে কাজ করেছেন। এখনও বিভিন্ন নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করছেন। করছেন বিভিন্ন অ্যালবামের কাজ।

বাংলাদেশের রিদম প্রোগ্রামিং এর কিংবদন্তী লিটন ডি কস্টার উত্তরসূরী জাহিদ হাসান বাবু। তাঁর কম্পোজিশন মানেই সময়ের আধুনিক কম্পোজিশন। যে রিদম তিনি ব্যবহার করেন সেটি সবসময়ই অনন্য। কোন কর্ডের পর কোনটি হবে-সেটি অনায়াসলব্ধ অভিজ্ঞতায় যেন তাঁর আঙ্গুলের ডগায় এসে যায়। নতুন শিল্পীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘একজন শিল্পীর মূল অস্ত্র কঠোর পরিশ্রম আর সাধনা। সঙ্গীত শিল্পী হওয়ার শর্টকার্ট কোন রাস্তা নেই। মৌলিক গান ছাড়া একজন শিল্পী কোনো দিন দর্শক-শ্রোতার মধ্যে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারবে না। মৌলিক গান তাকে গাইতেই হবে, সেগুলোই টিকে থাকবে।’ পেয়েছেন অসংখ্য পুরষ্কার। রিদমিস্ট হিসেবে দেশের সীমানা পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পারফরম করেছেন।

বাংলা গানের দুটি মূল উপজীব্য-লিরিক্যাল ভ্যালু ও মেলোডি। বাংলা গানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ দুটির কোনো বিকল্প নেই। এগুলো বাদ দিয়ে কোনো বাংলা গানই স্থায়ী হবে না বলে মনে করেন জাহিদ হাসান বাবু। গানের পেছনের মানুষ তিনি। দর্শক-শ্রোতারা তাঁকে না চিনলেও বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের সকলের প্রাণের মানুষ তিনি। আজ এই গুণী মানুষটির জন্মদিন। গভীর শ্রদ্ধা আর অনেক অনেক ভালবাসায় আজ আমরা স্মরণ করছি গানের মানুষ প্রাণের মানুষ জাহিদ হাসান বাবুকে।