করোনায় নিস্তব্ধ হয়ে গেছে কামাররা; হারিয়ে যাচ্ছে সেই “ঠুক-ঠাক” শব্দ

11
Spread the love

শাহজাহান সিরাজ ,কয়রা:

পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে কয়রা উপজেলায় ব্যস্ততা বাড়িনি কামার পাড়াগুলোতে। হাতুড়ি পেটানো ঠুক-ঠাক শব্দে এখন আর মুখর নেই কামারপাড়ায়। বিশ্বে মহামারি করোনা প্রকোপ থাকার কারনে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষদের জীবন পরিচালনা করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মরনব্যাধী করোনা ভাইরাস এক নিমিষে বদলে দিয়েছে প্রতিটি মানুষের জীবন চলার গতিকে। করোনা ভাইরাস যেমন পুরোবিশ্বকে গ্রাস করে আছে বন্ধ করে দিয়েছে মানুষের স্বাধীনতা আর তখনি প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘূর্ণিঝড় আম্পান পাল্টে দিয়েছে তাদের দৈনন্দিক জীবনধারাকে। জীবন কেড়ে নেওয়া করোনা ভাইরাস ও পথে বসিয়ে দেওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান আর এরি মধ্যে সামনে চলে আসল মুসলমানদের সবচেয়ে বড় খুশির দিন ঈদ-উল আযহা। কিন্তু এই মর্মান্তিক পরিবেশে কারো মুখে কোন খুশির আবছায়া নেই। আর নেই কামারদের সেই ঠুক-ঠাক শব্দ।মনে হয় এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেছে কামাররা, বাতাসে হারিয়ে গেছে লোহার দা, ছুরি, চাকু, কোদাল, চাপাতি ইত্যাদি এইসব জিনিসপত্র বানানোর সময় সেই ঠুক-ঠাক শব্দটি।

বৃহস্পতিবার দিনভর সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নে কামারপাড়া এলাকাটি ঠিক এমনিভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। এখানে যুগযুগ ধরে বসবাস করে আসছে ৩০/৪০ টি কামার পরিবার। অনেকেই আবার এই পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশাকে বেছে নিয়েছে। বর্তমানে  এই কামারপাড়া এলাকাটিতে নেই কোন কাজ, নেই কোন শব্দ। কয়েকমাস আগের কথা, যখন কামারদের এই ঠুক-ঠাক শব্দের কারনে উক্ত এলাকার মানুষজন ঠিক করে ঘুমাতে পারতো না। ্আর এখন কেমন এক শান্ত পরিবেশে নিঝুম হয়ে আছে কামারপাড়া এলাকাটি। ঈদ-উল আযহা আসার প্রায় ১ থেকে দেড় মাস আগে থেকে কামার পাড়া এলাকাটি প্রায় দিন-রাত ২৪ ঘন্টায় এক অদ্ভুদ তরঙ্গে সময় কাটাতো। এমনকি কামাররা দুবেলা খাওয়ারও সময় পেত না। কিন্তু এই মরনব্যাধী করোন ভাইরাসের কারনে কয়রা উপজেলার বেশিরভাগ মানুষ কোন পশু কোরবানী দিচ্ছে না।

আমাদী ইউনিয়নের কামারপাড়া এলাকার কয়েকজন কামার বিধান, সীমান্ত, কার্তিক ও অসীম কর্মকারের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আমাদের বাপ দাদা সকলে এই কাজ করে আসছে। আর আমরা বংশ্বধর হওয়ায় নিজেদের এই বংশ পরস্পরা এগিয়ে নেওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকে আমরা এই কাজ করে আসছি। আমাদের এই কামারপাড়া এলাকাটিতে রাত দিন ২৪ ঘন্টায় চলে লোহার ঠুক-ঠাক শব্দ। এমনকি শব্দের কারনে এই এলাকার মানুষরা ঠিকমত ঘুমাতে পারতো না এমন অভিযোগ দিয়েছে অনেকেই। কিন্তু এ বছর সেই ব্যস্ততা, ঠুক-ঠাক শব্দ আর নেই। করোনায় তাদের মুখের হাসিও ফুরিয়ে গেছে। অথচ সারা বছরের ধার-দেনা পরিশোধের সময়টাতেই আজ তারা অলস সময় পার করছেন। এতে তাদের ধার -দেনা কমার পরিবর্তে দেনার পরিধি আরো বাড়ছে।

ইউনিয়নের অসীম কর্মকার বলেন, আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রভাবে কামার শিল্পের দুর্দিন চললেও প্রতি বছরই কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে জমে উঠতো এ শিল্প। তাই তো আমরা প্রতিবছরই কোরবানীর এই সময়টার অপেক্ষায় থাকি। কারন এই সময়ে সারা বছরের ধার-দেনার পরিশেধের সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার করোনায় আমাদের সব আশা শেষ হয়ে গেছে। কামারপাড়ার কারিগর গনেশ বলেন, ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। প্রতি বছর এই সময়টায় অনেক ব্যস্ত থাকি। যত দিন গড়াবে ব্যস্ততা বাড়বে।  সকাল ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত। ঈদের আগের দিনে অনেক অর্ডার ফেরত দিতে হয়। ঈদের আগের রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করতে করতে সকাল হয়ে যায়। কিন্তু এখন করোনা সব থামিয়ে দিয়েছে। নজমল কারিগর বলেন, এ শিল্পে কয়লা সহ অন্যান্য কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়েনি তাদের জিনিস পত্রের দাম। মাস গেলে গুনতে হচ্ছে কর্মচারির বেতন। তিনি বলেন, এ পেশায় পরিশ্রমের চেয়ে পারিশ্রমিক কম। তবুও পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া এই পেশাই উৎসাহের  কমতি নেই কামার পল্লীর এসব কর্মকারদের।