প্রধানমন্ত্রীর নানামুখী চ্যালেঞ্জ

2
Spread the love

ফনিন্দ্র সরকার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেম্স ম্যাকগ্রেগর বার্নসের নাম অনেকেই জানেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংক্রান্ত তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্যে তিনি সু-পরিচিত। বিশ্বে তাকে রাজনীতিকদের নিয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের অথরিটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বিষয়ে তিনি জবরদস্ত আলেম, মান্যবর। তার একটি বিখ্যাত বই লিডারশিপ। এতে তিনি দু-ধরনের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী স্থানীয় বা জাতীয় রাজনীতিতে একদল নেতা আছেন যারা শুধু আদান প্রদান নির্ভর। তারা নিজের সুযোগ সুবিধা, ক্ষমতা এবং নিজের স্বার্থ বলয়ের বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না। তারা গদিতে বসেন, গদি হারান। কিন্তু সমাজ ও মানুষের মনে চিরস্থায়ী কোন প্রভাব ফেলতে পারেন না। মানুষ একটা সময়ের পর তাদের আর মনে রাখে না। এ ধরনের নেতাদের তিনি বলেছেন ঞধহংধপঃরড়হধষ ষবধফবৎ। আরেক দল নেতা আছেন তারা বিরল প্রকৃতির। তারা উঁচুমাপের অন্যরকম নেতা। একটা জাতি ও দেশে তাদের দেখা মিলে যুগ যুগ ব্যবধানে। তারা সমাজকে আলোর পথ দেখান। ঘরে ঘরে জ্বালেন উন্নয়ন ও জীবনমুখী শিক্ষার প্রদীপ। জেম্স বার্নস এ ধরনের নেতাদের বলেছেন ঞধহংভড়ৎসরহম ষবধফবৎংযরঢ়। বার্নসের লিডার তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই বিরল প্রকৃতির নেতা। বর্তমানে তাঁর কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সে ধরনের নেতা। যিনি কিনা সুজলা সুফলা বাংলাদেশকে রক্ষা করে চলেছেন জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে। আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান- এই সর্বনাশা স্লোগানধারী অপশক্তি রুখে দিয়েছেন তিনি। দেশে ঘটিয়েছেন নারী জাগরণ, উন্নয়ন আর ভাগ্যবদলের সুযোগ পৌঁছে দিয়েছেন সবার ঘরে ঘরে। এখন আমাদের দেশে চলছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অগ্রগতির যুগ সন্ধিক্ষণ (ঞৎধহংধপঃরড়হধষ ঢ়যধংব)। এই উৎক্রমণকালের কা-ারি শেখ হাসিনা ছাড়া আর কী কেউ হতে পারেন? নাকি হওয়া উচিত? সহজ কথায় শেখ হাসিনা ছাড়া কি উন্নয়ন ইতিহাস লেখা সম্ভব? উত্তর হবে, না।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের হিং¯্র থাবায় সপ্তমহাদেশযুক্ত পৃথিবী নামক গ্রহটির প্রচুর প্রাণশক্তি সম্পন্ন জীব শ্রেষ্ঠ মানব জাতির জীবন প্রবাহটা যখন অনেকটাই থমকে গেছে, তখনও থেমে থাকেনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্ম প্রবাহ। একদিকে চলছে কভিড-১৯সহ নানা দুর্যোগ মোকাবেলার যুদ্ধ, অন্যদিকে জীবন জীবিকার স্বার্থে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকান্ড। এ দুইয়ের সমীকরণে থেকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে শেখ হাসিনা জাতিকে আশার আলো দেখিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, ‘ইমপ্যাক্ট অব-কোভিড-১৯ অন দ্য বাংলাদেশ ইকোনমি এ্যান্ড সিলভার লাইনিংস শীর্ষক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে হংকং এ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) এশিয়ান ইকোনমিক্স রিসার্চ ফেডারিক নিউম্যান তার বক্তব্যে বলেছেন- ‘করোনার অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশ ভালই সামাল দিচ্ছে।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাও ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সন্তোষজনক অর্থনৈতিক সহিষ্ণুতা দেখিয়ে চলেছে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূলে ছিল সুদৃঢ় নিয়মানুবর্তিতা, গ্রহণযোগ্য মুদ্রাস্ফীতি ও বহির্গামী পেমেন্টের শক্তিশালী অবস্থান। বৃদ্ধি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য, বেড়েছে রেমিটেন্স যা স্থানীয় চাহিদাকে সামাল দিয়েছে। কোভিড-১৯-এর উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ অর্থনীতিকে ভালভাবে সামাল দিতে সক্ষম হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে সরকার চাহিদা পূরণে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কেবল শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব।

দেশপ্রেম এবং নৈতিকতাবোধই একথা বলতে বাধ্য করে যে, ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাঙালী জাতি ও দেশ দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এ জাতি যেন ছিল জীবন্মৃত। রাজনৈতিক পরিক্রমায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে¡র গুণেই আমাদের মধ্যে নতুন করে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। নিন্দুকেরা যে যা-ই বলুক এ সত্যকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, বিশ্ব সভায়ও এ সত্য চাপা থাকেনি। মহামারী করোনাকালে ভবিষ্যত সুন্দর বাংলাদেশের পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন তিনি। তিনি এক শ’ বছরের ডেলটা প্ল্যান নির্দিষ্ট করে কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে, গত বছর ১৪ এপ্রিল নাইজিরিয়ান একটি প্রভাবশালী দৈনিক ‘দি ডেইলি লিডারশিপ, এ বিশ্বের পাঁচ সেরা নীতিনিষ্ঠ নেতার তালিকায় শেখ হাসিনার নামটি যুক্ত করেছে। দৈনিকটির আনরিপোর্টেড বিভাগে প্রকাশিত ড়িৎষফং ড়ংঃৎরড়ৎ ঢ়ৎবংরফবহঃ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে নীতিনিষ্ঠ সেরা পাঁচের যৌক্তিক বিবরণ তুলে ধরা হয়। তাদের এ প্রতিবেদনটি আমাদের কাছে মুখ্য নয়, আমাদের কাছে মুখ্য বিষয়টি হচ্ছে জীবনে শুদ্ধতা, কল্যাণ কর্মে নিষ্ঠা ও কর্মকুশলতা শেখ হাসিনাকে অন্য এক উচ্চতায় পর্যবসিত করেছে। বাঙালী জাতি বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ নিয়ে যে সাধনায় বঙ্গবন্ধু তাঁর সারাজীবন অতিক্রান্ত করেছেন তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে শেখ হাসিনা কর্মের মধ্য দিয়ে বিচিত্র পথের সন্ধান দিয়ে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার আদর্শ সেবা ও ত্যাগ জাতীয় আদর্শে রূপান্তরিত হয়েছে। যে জন্যে বড় বড় অন্যায় অন্যায়কারী ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। সুযোগ পাচ্ছে না বলেই সেগুলো গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। এ নিয়ে যত হৈচৈ। বিরোধী পক্ষ এ সব বিষয় নিয়ে সমালোচনা করছে এবং শেখ হাসিনার সরকারকে দুর্নীতিবাজ বলেও গাল দিচ্ছে। কিন্তু তারা কী এটা কখনো ভেবে দেখেছে যে, শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই অপকর্মগুলো ধরা পড়েছে। তার নীতিনিষ্ঠ আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটেছে। এটা ঠিক শেখ হাসিনা আজ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। কেননা ঘরে বাইরে তার বিরুদ্ধে সু-গভীর চক্রান্তের জ্বাল পাতা হয়েছে। তবে তিনি এ সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও চক্রান্তের জ্বাল ছিন্ন করে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, সে বিশ্বাস ইতোমধ্যেই দৃঢ় হয়েছে সবার মনে। এই যে বৈশ্বিক মহামারী করোনাকাল চলছে তার মধ্যে আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার প্রকোপে দিশেহারা বিশাল জনগোষ্ঠীকে কিভাবে রক্ষা যায় সে পরিকল্পনাও ঠিক করে রেখেছেন। একটি মানুষও যাতে খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ না করে। অভাবী মানুষের জীবন প্রবাহ যেন থমকে না যায় সে দিকটাও খেয়াল রাখছেন।

বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘে শেখ হাসিনা কর্তৃক উত্থাপিত প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। এ পর্যন্ত এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য এবং ১৬৯টি উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিশ্ব সভায়। এগুলোর মধ্যে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি হস্তান্তর শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শহর ও নগর অভিবাসন উন্নয়ন মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, জল সম্পদের আন্তঃদেশীয় ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নীল অর্থনীতি (সাগর-মহাসাগর) বিশ্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ, শান্তি স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, এম ও আই এলডিসি ইস্যু ইত্যাদি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিরোধী গোষ্ঠীর ব্যাপক বিরোধিতা ও নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দৃঢ়তা ও সততার সঙ্গে নেতৃত্ব দেয়ার ফলে দেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেই সাথে নারীর ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনাকে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমেরিকান প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশ নিয়ে মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, যদি সন্ত্রাসবাদ কোথাও মাথাচারা দেয় তবে তা হবে পাকিস্তানে, কখনো বাংলাদেশে নয়। কারণ বাংলাদেশে রয়েছে শেখ হাসিনার মতো নীতিবান নেতা। নারী শিক্ষার বাস্তবায়ন ও ক্ষমতায়ন হয়েছে বাংলাদেশে। করোনা মহামারী উত্তর পৃথিবী বদলে যাবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির ধরন পাল্টে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকেও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। শেখ হাসিনা সে উপলব্ধির আলোকেই মানবতাকে প্রাধান্য দিয়ে বদলে যাওয়া পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনে এ বছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করেছেন। তিনি গ্রামীণ অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। শহরের আদলে গ্রাম হয়ে উঠবে আধুনিক ও উন্নত। লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক