তিনশ বছরের সাক্ষী হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে যে বটগাছ

18
Spread the love


ভানভীর আহমেদ:

আজো বটগাছটি দেখতে ছুটে যায় মানুষ ঝিনাইদহের মল্লিকপুরে। মানুষের সমাগমের কারণে বটগাছটি ঘিরে গড়ে উঠেছে রেস্ট হাউজ। বলা হয়, এ বটগাছটি এশিয়ায় বৃহত্তম। 

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ শহর থেকে ৯ কিলোমিটার পূর্ব দিকে কালীগঞ্জ-আড়পাড়া পাকা সড়কের পাশ ঘেঁষে কয়েক শতকের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অতি প্রাচীন এ বটগাছ। বড় বড় ডালপালাগুলো বয়সের ভারে চারপাশে নুয়ে পড়েছে।

বটগাছটির পূর্ব ও দক্ষিণ দিক দিয়ে চলে গেছে কালীগঞ্জ থেকে মাগুরা জেলার আড়পাড়া যাওয়ার পাকা সড়ক। আর পশ্চিম দিকে মল্লিকপুর গ্রামে প্রবেশের একমাত্র সড়ক।

বটগাছটির নিচে রয়েছে সামাজিক বনবিভাগ যশোরের একটি পাকা স্তম্ভ। তাতে লেখা ‘এশিয়া মহাদেশের প্রাচীণ ও অন্যতম বৃহত্তম বটবৃক্ষ’। তাতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে ২৫০-৩০০ বছর আগে বটগাছটি এখানে জন্মেছিল। জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে সামাজিক বনবিভাগ- যশোর বটগাছটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। হয়তো তারপরেই পাকা স্তম্ভটি বসানো হয়েছে।

বনবিভাগ হতে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, এখানে জন্মানো আসল গাছটি এখন আর নেই। বর্তমানে ৪৫টি ভিন্ন ভিন্ন বটগাছ এক হয়ে ৩ একর ৯১ শতক জমি জুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে আছে। যার মধ্যে মোট ৩৪৫টি বায়বীয় মূল রয়েছে। যে মূলগুলো মাটির গভীরে প্রবেশ করেছে। আর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে ৩৮টি মূল।

বটগাছটি কোন স্থানে প্রথম জন্মেছিল তা নিয়ে রয়েছে স্থানীয় লোকজনের নানা মত। মল্লিকপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বয়োবৃদ্ধ দলিল উদ্দীন জানান, পশ্চিম পাশের বর্তমানে যে দিক দিয়ে প্রাচীর রয়েছে- এ প্রাচীরের কোলঘেঁষে একটা কুয়া ছিল। ছোটবেলায় তিনি মুরব্বিদের মুখে শুনেছেন এখানেই এ বটগাছটি জন্মেছিল। পরে বোয়া ছেড়ে চারদিকে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

এতো বিশাল এলাকা জুড়ে থাকা বটগাছটির আঙিনা সারাক্ষণ হাজারো পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকছে। কেবল কি পাখি, বটগাছটি কেন্দ্র করে নানা ধরণের মানুষেরও আনাগোনা এখানে। কেউ আসেন শুধুই দেখতে, কেউ বেড়াতে, আবার কেউ আসেন বটগাছটিকে ভক্তি জানাতে। মানত নিয়েও আসেন কেউ কেউ। অর্থাৎ বিচিত্র সব কাণ্ড ঘটে গাছটিকে ঘিরে।

সারাবছরই এখানে দর্শণার্থীদের ভিড় থাকে। তবে শীত মৌসুমে বনভোজনের জন্য ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বেথুলী গ্রামের ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষেরা এ গাছতলাতে সকাল বিকাল উপাসনা করেন। এলাকাবাসীর উদ্যোগে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে সাতদিন ব্যাপি বসে বৈশাখী মেলা। মেলা চলাকালীন রাতগুলোতে বসে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালী, মুর্শিদি, পালা, বাউলসহ শেকড়ের গানের আসর। এ সময় এখানটা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

বটগাছটির নিচে আলাপ হয় বেথুলী গ্রামের বাসিন্দা সুমন মোল্যার সাথে। তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা প্রায়ই এ বটগাছটি দেখতে আসেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এলাকাবাসীর কাছে আশ্বাস দেন বটগাছটির শ্রীবৃদ্ধির জন্য কাজ করবেন।  সরকারিভাবে এখানে পূর্ণাঙ্গ পিকনিক স্পট গড়ে তোলার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সব আশ্বাসই থেকে গেছে।

সুমন মোল্যা জানান, ছোটবেলায় মল্লিকপুর ও বেথুলী পাশাপাশি গ্রাম দুটির মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে পাল্লা দেখেছেন। কিন্ত এ বটগাছটির প্রশ্নে সকলেই এক। বর্তমানে এ এলাকার আশপাশের ৩০/৪০ গ্রামের মানুষেরা বলেন এটা আমাদের সকলের সম্পদ।

তিনি জানান, দুর দুরান্ত থেকে আসা দর্শণার্থীদের জন্য ১৯৮৫ সালে প্রথমে নির্মিত হয় একটি রেস্ট হাউজ। সম্প্রতি আরেকটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ করা হয়েছে। মালিয়াট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শওকতুল ইসলামের প্রচেষ্টায় গাছটির চারিদিকে প্রাচীরের ব্যবস্থা করা হয়।

মল্লিকপুর গ্রামের আলহাজ্ব আয়ুব হোসেন জানান, বটগাছটি ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে অতীতে এলাকার মানুষ সরকারের উচ্চ মহলে অনেক ধর্ণা দিয়েছেন। বর্তমানে এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষন প্রকল্পের আওতায় রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব নিলেও দৃশ্যমান তেমন কোন উন্নতি ঘটেনি।

ঝিনাইদহ জেলা বনকর্মকর্তা গিয়াস উদ্দীন মুকুল জানান, এক সময়ে এ বৃক্ষটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তেমন কোন সরকারি উদ্যোগ ছিল না। কিন্ত ২০০৯ সালে বনবিভাগ দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি রেস্ট হাউজ হয়েছে। বনবিভাগের পক্ষ থেকে দেখাশোনার জন্য লোকবল নিয়োগ করেছে। নতুন করে প্রায় দুই একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়াও অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।