রাজনীতির হালচাল ও কতক প্রশ্ন

6
Spread the love

-শেখর দত্ত

দুদক ইতোমধ্যে পাপলু দম্পতি, তার কন্যা ও শ্যালিকার সব ব্যক্তিগত ফাইল তলব করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পরিচালক পদ স্থগিত করেছে। সবশেষে বলতে হয়, দুদকে তদন্ত কাজ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতির ভিত্তিতে অগ্রসর হোক, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ঘটনার তদন্ত করে পাপলুসহ যে বা যারা অনিয়ম, অনৈতিক ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক- এটাই আজকের একান্ত কামনা।

পাপলু এমপির ঘটনা সংবাদ পাঠক-শ্রোতা বিশেষত সচেতন নাগরিকরা সবাই কমবেশি জানেন। সংবাদমাধ্যম বাড়তি-কমতি যা-ই হোক, সব খবর প্রকাশ করেছে। যতটুকু মনে পড়ে, ফেব্রুয়ারি মাসে কুয়েত আল কবাস ও কুয়েত টাইমস নামে ওই দেশের দুটো পত্রিকা মানবপাচার ও ভিসা কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ করে পাপলু এমপিকে অভিযুক্ত করে। বিদেশে সংসদ সদস্যের অর্থ কেলেঙ্কারি! করোনা-আতঙ্কের মধ্যেও অপমানিত বোধ করায় জনগণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফেব্রুয়ারিতেই দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক পাপলু এমপির অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত ফাইল খুলে। বিষয়টা এতটুকু অগ্রসর হওয়ার পর থেকে ৫ জুন কুয়েতে পাপলু এমপি গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল, সংসদ বা দুদকের তেমন কোনো নড়চড় প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়নি।

প্রসঙ্গত বলতেই হয় অন্য সব ঘুষ-দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাৎ-কেলেঙ্কারির সঙ্গে পাপলু এমপি ঘটনার ‘আগরতলা-চকিরতলা’র (ছোটবেলার কথা) মতো পার্থক্য রয়েছে। একটি দেশের প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদ হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ- এই তিন অঙ্গের হৃৎপি- হচ্ছে সংসদ, রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনার মান, রাজনৈতিক দলগুলো ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ-পথের বাধা-সীমাবদ্ধতা, বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে ‘জোর যার মুল্লুক তার নীতি’র জয়জয়কার, সর্বোপরি সিস্টেমের দুর্বলতা প্রভৃতি কারণে সংসদ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে এবং থাকতেই পারে; সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলবে, সময় নিয়ে তা দূরীকরণের প্রচেষ্টাও চলবে; এটা বিধিলিপি বিচারে ঠিক হয়তো আছে; কিন্তু একজন সংসদ সদস্য তো সংসদের অবমাননা করতে পারেন না!

তাই ফেব্রুয়ারি-জুন সময়কাল বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ৩ মাসে পাপলু এমপির বিষয়ে দুদক তদন্ত করেছে কিনা, করলে ফলাফল স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার স্বার্থে জনগণকে জানানোর প্রয়োজন কি ছিল না? সংসদ অবমাননার বিষয় যেহেতু জড়িত, সংসদ কি সেখানে কোনো তদন্ত করেছে, তদন্ত করার কি কোনো পদ্ধতি সেখানে আছে? সর্বোপরি সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টা ঠিক আছে। কিন্তু দলের কি আইন নেই? গঠনতন্ত্র তো আছে। সে অনুযায়ী কি পাপলু এমপি সংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে দলে অভ্যন্তরীণ কোনো তদন্ত হয়েছে? শেষ বিচারে আওয়ামী লীগ দল তো জনগণের, নেতাকর্মীদের? গঠনতন্ত্র রক্ষা বা দলের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা হলে দলগত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেয়া কি হবে না? দলকে, জনগণকে কি জানানো হবে না?

সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, দেশে এমন এক রাজনৈতিক কালচার দাঁড়িয়ে গেছে, বিরোধী দলে থাকলে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বা মামলা হলে বলা হবে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে মামলা দিয়েছে আর ক্ষমতায় থাকলে সরকার ব্যবস্থা নিবে বলা হবে। প্রশ্ন হলো ক্ষমতায় দল থাকলে দলের কারো বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান কতটা ব্যবস্থা নিতে পারে? তাই মনে হয় জিরো টলারেন্সটা প্রথমে প্রযোজ্য করতে হবে দলের ক্ষেত্রে। তবেই কেবল সরকার জিরো টলারেন্সে যেতে পারবে। এ ক্ষেত্রে অতীতে ফিরে তাকানো ছাড়া বিকল্প নেই। পঞ্চাশের দশকে আওয়ামী লীগের দলীয় গঠনতন্ত্রে ছিল, মন্ত্রী হলে দলের পদাধিকারী থাকা যাবে না। তরুণ নেতা শেখ মুজিব মন্ত্রীপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দলীয় সাধারণ সম্পাদক পদটি বেছে নিয়েছিলেন। আবার দলে বঙ্গবন্ধু কথিত ‘চাটার দল’-এর উৎপাতে ১৯৭৪ সালে এসে তিনি সরকার থেকে দলকে আলাদা করতে দলীয় সভাপতি পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রশ্নটা হলো অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা কতটুকু কীভাবে প্রয়োগ করা যাবে, এটা দলের হাইকমান্ডকেই ঠিক করতে হবে।

ফেব্রুয়ারিতে পাপলু এমপির ঘটনা জানার পর তদন্ত বিষয়ে বিদেশের দিকে চেয়ে না থেকে দেশেই তদন্ত বেশি অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কেননা পাপলু দম্পতি দুজনের সংসদ সদস্য হওয়ার গল্প-কাহিনী নির্বাচনের আগে থেকেই প্রচারিত ছিল। যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ রয়েছে এই দম্পতির কাছে। জুলিয়াস সিজারের এলাম, দেখলাম, জয় করার মতো। ১৯৯২ সালে যে ব্যক্তিটি উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাচাতো ভাইয়ের হাত ধরে সাইপ্রাস যায়, সেই লোকটি মাত্র দুতিন দশকের মধ্যে কীভাবে ২০১৬ সালে অর্থাৎ ২৪ বছরে কুয়েত থেকে দেশে এসে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের হাত ধরে ‘ধনকুবের দানবীর’ এবং আওয়ামী লীগার হিসেবে সমাজে পরিচিতি পেয়ে যায়। একটি ব্যাংকের পরিচালক, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যাংক সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান হয়ে যায় কীভাবে? জামায়াতের দিগন্ত টিভি, নয়াদিগন্ত, দিগন্ত মিডিয়ার নাকি পরিচালক রয়েছেন তিনি। স্ত্রী সেলিনা তো ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা এনে সিআইপিও হয়ে গেছেন।

হায় রে আমাদের সমাজ অর্থনীতি, রাজনীতি! অর্থ থাকলে সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেতে এক মুহূর্তও লাগে না! এটা রাজনীতির অতীত ঐতিহ্য তিল তিলে শ্রম ও মেধা দিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ঠিক বিপরীত! এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলা যাবে বা হবে কি না জানি না, তবে বঙ্গবন্ধুর দলে এমন হওয়াটা একেবারেই দুর্ভাগ্যজনক। ক্যান্টনমেন্টে গড়া দলের সঙ্গে ‘নর্দমায় গিয়ে লড়তে হবে’ কথাটা আমি বলেছি, এখন এ ঘটনা দিয়ে এটা কি বলা যাবে ক্রমে নর্দমার আরো গভীরে যাচ্ছি? ভাগ্যই ভালো, ‘কীর্তিমান দানবীর’ দম্পতি পাপলু ও তার স্ত্রী সেলিনা যথাক্রমে লক্ষ্মীপুর দুই ও কুমিল্লা এক আসনে আওয়ামী লীগে প্রার্থী হওয়ার আবেদন দিয়েও মনোনয়ন পায়নি। ঐতিহ্যবাহী নৌকা প্রতীক না দিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য কাজ করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো লোভনীয় পদটি যখন মহাজোট ও জাতীয় পার্টির বহুল আলোচিত প্রার্থী সহজবোধ্য কারণে ছেড়ে দিয়ে আত্মগোপন করে, তখন স্থানীয় দলের সিদ্ধান্ত ভেঙে যিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন, সেই ব্যক্তিটির পক্ষে স্থানীয় আওয়ামী লীগ দাঁড়ায় কীভাবে, কোন কারণে? সর্বোপরি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রার্থী পরিচিতির চিঠি পাপলু সাহেব পান কি করে? সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরিত চিঠি তো ছিল না বলেই জানা যায়। তার অজানায় এসব হয়েছে বলেই তো মনে হয়। অজানা বলা হলো এ কারণে যে, সাম্প্রতিক সময়ে সহসম্পাদকদের চিঠি, যাতে শত্রুদলের লোকও ছিল, তাদের কাছে চিঠি তো গিয়েছিল সভাপতির অজান্তেই। সর্বোপরি স্ত্রী সেলিনা সংরক্ষিত কোটায় এমপি হলেন কীভাবে? সক্রিয়, পরিশ্রমী ও নির্যাতিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পদবঞ্চিত হয়ে ক্ষুব্ধ থাকেন তো এসব কারণেই। বলাই বাহুল্য, দেশ-জাতি-জনগণের উন্নতি-কল্যাণে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নিরলস কাজ, ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অধিকার কিন্তু এমন সব ব্যক্তি বা ব্যক্তির নেই। কেননা দুধের মধ্যে একটু চানা পড়লেই ঘটে বিপত্তি।

পাপলু এমপির কুয়েতের প্রসিকিউটরের কাছে কিছু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, তাকে রিমান্ড থেকে জেলে নেয়া, সেখানকার ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সেখানে তার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্নেল ও জনশক্তি বিষয়ক কর্মকর্তা কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়া প্রভৃতির পর আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছেন, কুয়েত সরকার জানালে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওই দেশের দিকে চেয়ে কি আমরা বসে থাকব? আশার কথা, দুদক ইতোমধ্যে পাপলু দম্পতি, তার কন্যা ও শ্যালিকার সব ব্যক্তিগত ফাইল তলব করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পরিচালক পদ স্থগিত করেছে। সবশেষে বলতে হয়, দুদকে তদন্ত কাজ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতির ভিত্তিতে অগ্রসর হোক, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ঘটনার তদন্ত করে পাপলুসহ যে বা যারা অনিয়ম, অনৈতিক ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক- এটাই আজকের একান্ত কামনা। প্রসঙ্গত, খবরে জানা গেল জাতীয় পার্টি আসন ছেড়ে আত্মগোপনকারী ওই নেতাকে বহিষ্কার করেছে। জাতীয় পার্টি যদি পারে তবে, আওয়ামী লীগ পারবে না কেন? শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।