৬ দিনে ৩৬ মৃত্যু : কারণ শুধুই নিউমোনিয়া ?

1
Spread the love


আবু আজাদ :


২ জানুয়ারি ২০২০। চারদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা যান সাবেক সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী। সে সময় তার মুত্যুর কারণ হিসেবে ‘এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া’কে (অস্বাভাবিক নিউমোনিয়া) দায়ী করেন চিকিৎসকরা। গত ২৭ মার্চ রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া।
নিউমোনিয়া বা এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যে শুধু এ দুই রাজনীতিবিদের মৃত্যু হয়েছে তা কিন্তু নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের হিসাবে, গত ৬ দিনে দেশের ২৯ জেলায় জ্বর-সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা গেছেন ৩৬ জন। চিকিৎসকরা এদের মৃত্যুর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও কিছু ক্ষেত্রে এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ার কথা বলেছেন।
এমনিতেই করোনাভাইরাস আতঙ্কে পুরো দেশ। সেই আতঙ্কের মাঝেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ নতুন করে আশঙ্কা জাগাচ্ছে মানুষের মনে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে মেহেরপুর সদর উপজেলার কোলা গ্রামে শ্বাসকষ্টে ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, মাগুরায় এক কলেজ ছাত্র ও সাতক্ষীরায় এক সবজি বিক্রেতার মৃত্যু হয়েছে। এর আগে বুধবার (১ এপ্রিল) চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি এক কিশোরের মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া ‘য় আক্রান্ত হয়ে ওই কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি গনমাধ্যমকে বলেন, ‘কক্সবাজারের যে ছেলেটি চট্টগ্রামে আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় মারা গেছে, তার নমুনায় করোনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া তার বিদেশ ফেরত কারও সংস্পর্শে থাকারও ইতিহাস নেই। আমরা ধারণা করছি এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মূলত এটা ফু’র মৌসুম। এই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই সর্দি-কাশি হয়ে থাকে মানুষের। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায়ই রোগী মারা যায়। কিন্তু এখন করোনার কারণে সব মৃত্যুই গণনায় আসছে, সেই কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি সামনে চলে আসছে।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার বছরের মধ্যে এই মৌসুমেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার বছরের মধ্যে এই মৌসুমেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছে। শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন (এআরআই) বলতে সর্দি-কাশি, গলাব্যথা থেকে শুরু করে ব্রঙ্কাইটিস (শ্বাসনালীর ভিতরে আবৃত ঝিল্লিতে সংক্রমণ), ব্রঙ্কোলাইটিস ও নিউমোনিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে।
নিয়ন্ত্রণকক্ষের তথ্যমতে, এ বছরের মার্চে গত বছরের মার্চের তুলনায় এআরআইতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৪ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এ বছর ৩০ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৯৩০। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮২০, ২০১৮ সালে ১০১০ এবং ২০১৭ সালে ১৪১ জন। একইভাবে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এআরআইতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৯৫০, গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪৬০। এর এক মাস আগে অর্থাৎ জানুয়ারিতে রোগীর সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৬৪১। গত বছরের জানুয়ারিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫২০।
গত চার বছরের তুলনায় এ বছরই শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এতো বেশি কেন, এ প্রশ্ন তুলছেন খোদ চিকিৎসকরাই। তারা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের অবশ্যই করোনা পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
প্রদাহজনিত রোগ বা এআরআই রিপোর্টের একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরাও। সেটি হলো, গত নভেম্বর মাসে ২৯ জন মানুষ মারা যাওয়ার বিষয়ে জানানো হলেও পরের চার মাসে মাত্র একজন ব্যক্তি মারা গিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে ওই রিপোর্টে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া রোগীর করোনা পরীক্ষা করে আসলে তেমন লাভ নেই। কারণ মরদেহে থাকা ভাইরাস কয়েকঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। তাই করোনা পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর করছে কখন নমুনা সংগ্রহ হলো, পরীক্ষা হলো কখন, সেটার ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি সকল এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ার রোগীদের কোভিড-১৯ এর টেস্ট করার নির্দেশনা আছে। তাই সকল এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালগুলোতে তথ্য থাকে না, নয়তো গত তিন মাসে কী পরিমাণ মানুষ এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, সে তথ্য থাকলে এটির গুরুতর রূপ আমাদের সামনে আসতো। আর এখনতো রোগীরা নিজেই হাসপাতালে আসছেন না। তাই আমরা এর সঠিক হিসাব কোনোভাবেই পাব না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা আছে, মূলত যখন করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটবে তখন আমরা সব এটিপিক্যাল নিউমোনিয়া রোগীকে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসবো ।’
এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় মৃত্যু নিয়ে বিশ্বে কী হচ্ছে?
দেশের গণমাধ্যমে গত ৬ দিনে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৩৬ জনের মৃত্যুর যে খবর প্রকাশ হয়েছে, সংশ্লিষ্টরা মনে করেন প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা আরও বেশি। তবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে শুধু যে আমাদের দেশেই মানুষ মারা যাচ্ছে, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়, করোনা প্রাদুর্ভাব বা এর আগে সার্স, নিপাহ বা স্প্যানিশ ফু রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ও অনেক মানুষ নিউমোনিয়ায় ও এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন সারাবিশ্বে।-জাগো নিউজ