করোনার ছোবলে ছুটিতে গোটা বিশ্ব

4
Spread the love

বিশেষ প্রতিনিধি:

গত এক শ’ বছরে পৃথিবীর ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। পৃথিবীর এই ব্যস্ততা এর অধিবাসীকেও ব্যস্ত করে তুলেছে। রাত নেই দিন নেই মানুষ শুধু ছুটছে আর ছুটছে। আজ সেই ছুটে চলাকেই ছুটি জানিয়েছে পৃথিবী। ব্যস্ত সব প্রহরকে ছুটি জানিয়ে আজ দেশে দেশে মানুষ ঘরবন্দী। প্রকৃতি কি মানুষের এই অকান্ত ছুটে চলায় বিরাগভাজন হয়েছে। তাই কি অবিরত ছুটে চলাকে কিছুদিনের জন্য থামিয়ে দিয়েছে। প্রকৃতির বৈরিতায় আসুক অথবা করোনার আতঙ্কে পৃথিবীর জন্য এই ছুটি খুব দরকার ছিল।

সতেরো শ’ শতকের মাঝামাঝি থেকে আঠারো শ’ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে শিল্প বিপ্লব ঘটেছিল। সেই থেকে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। এর আরও একশ’ বছর আগে ফিরে তাকালে রেনেসাঁর খোঁজ মিলবে। বিশ^ব্যাপী চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত পৃথিবীতে নবজাগরণ সূচিত হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের এই সমাজ পরিবর্তনের ধারায় মধ্যযুগের বিলুপ্তি ঘটে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থান ঘটেছে। এই আধুনিকতা মানুষকে পণ্য আর সেবার সম্প্রসারণে ব্যস্ত করে তুলেছে। ব্রিটেনে কিছুটা আগে হলেও পৃথিবীতে শিল্পায়ন বিস্তৃত হয়েছে মূলত গত ১০০ বছরে। একজন কৃষক যেমন সারাদিন খেটে এসে রাত না হতেই হাই তুলতে তুলতে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানে শিল্পের ঠিক উল্টো চিত্র। মানুষ আট ঘণ্টাই কাজ করে এটি গোটা পৃথিবীর শিল্প শ্রমিকদের নির্ধারিত শ্রম ঘণ্টা। কিন্তু একজন শ্রমিক কি আট ঘণ্টাই কাজ করেন। নির্দিষ্ট সময়ের কাজের পর তিনি ওভারটাইম করেন। অতিরিক্ত পয়সা আয় করার জন্য। শ্রমিক যেমন অতিরিক্ত পয়সা আয়ের জন্য কাজ করেন তেমনি এর পরিচালক এবং মালিকরাও অতিরিক্ত আয়ের আশায় অবিরাম ছুটে চলেন। কিন্তু গত তিন মাসে পৃথিবীর দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া নোভেল করোনাভাইরাস মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করছে। পৃথিবী এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আর এই যুদ্ধ হচ্ছে অস্ত্র, গুলি বোমার নয় বরং রক্তপাতহীন দৃঢ় মানসিকতার যুদ্ধ। মানুষের গৃহবন্দী থাকার যুদ্ধ, ঘরে থাকার যুদ্ধ। মনে হতেই পারে বিষয়টি খুব সহজ। কিন্তু প্রতিদিন সকাল থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত যারা কাজ করেন তাদের জন্য ঘরে থাকা এক যন্ত্রণার নাম। কিন্তু একবার যদি ভাবেন, কত দিন নিজেকে নিজের পরিবারকে ঠিকঠাক সময় দেয়া হয়নি। সারাদিন সেই সময়টা দিন। পৃথিবীতে যখন যেমন ঠিক তেমন ভাবেই বেঁচে থাকাকে বলা হয় অভিযোজন। মানুষ সম্ভবত সব থেকে সফল অভিযোজন সক্ষম প্রাণী। সেই প্রমাণ আগেও পাওয়া গেছে। এবারও কষ্ট হলেও মানুষ ঘরেই থাকছে। তবে এই ঘরে থাকতে থাকতে মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে। তাদের ক্ষেত্রে অবশ্য দেশগুলো কঠোরও হচ্ছে।

জাস্টিন পিয়ারে জেমস ট্রুডো পৃথিবীর মানবিক রাষ্ট্রনায়কদের একজন। তিনি দেশের সব মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কেউ কেউ বাইরে বের হচ্ছিলেন। আর এ জন্যই ট্রুডোকে কানাডার নাগরিকদের ঘরে থাকার নীতির বিষয়ে কঠোর হতে বলতে হয়েছে, ‘ঘরে থাকুন নয়তো জেলে যেতে হবে’। করোনার বিস্তার রোধে তিন সপ্তাহের জন্য যুক্তরাজ্যকে লকডাউন করা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনাভাইরাসকে দশকের ‘বৃহত্তম হুমকি’ উল্লেখ করে লকডাউনের ঘোষণা দেন। জনসন স্পষ্ট করে বলেন, যদি কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করে তাহলে পুলিশ তাকে জরিমানা করবে। ভারতের নরেদ্র মোদি এক ঘোষণায় ১২০ কোটি মানুষকে ঘরে তুলে দিয়েছেন। মোদি জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছেন, লকডাউন, লকডাউন, লকডাউন। দেশটিতে সাধারণ মানুষকে ঘরের বাইরে যেতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

একই অবস্থা চলছে আমাদের দেশেও। লকডাউন ঘোষণা না করা হলেও সামাজিকভাবে বিছিন্ন রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। শহর এবং গ্রামের সবখানেই মানুষকে বিচ্ছিন্ন করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

শুক্রবার সন্ধ্যার হিসেবে সারাবিশ্বের পাঁচ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন ২৪ হাজার ১১০ জন। আর এক লাখ ২৩ হাজারের কিছু বেশি মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। দেশেও শুক্রবার নতুন করে চারজন আক্রান্ত হওয়ায় এই সংখ্যা বেড়ে ৪৮ এ দাঁড়িয়েছে। আর মারা গেছেন পাঁচজন। বিশ্লেষকদের মতে এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দেশ। সামাজিক বিস্তৃতি পর্যায়ের প্রাথমিক ধাপে রয়েছে। শুরুতে শুধু বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তীতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর এখন সমাজের একজন থেকে আরেক জনে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে। যা সব থেকে আশঙ্কার বিষয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার মানুষকে ঘরে থাকার বিষয়ে বাধ্য না করতে পারলে বিপদ অবধারিত। কিন্তু সরকার কতটা পারছে জনসমাগম সৃষ্টি থেকে বিরত রাখতে। এটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেনে হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। প্রতিদিন এখন অন্তত এক হাজার মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। পশ্চিমা দুনিয়াতেও চলছে ছুটি। লকডাউনে মানুষ ছুটি কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই লড়াই এখন পৃথিবীর কোন নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের জন্য নয়। এই যুদ্ধ পৃথিবীর মানুষের যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ জয়ের রণকৌশল হচ্ছে ঘরে থাকা। ছুটিতে থাকা। চীন জানুয়ারির শুরুতেই আঁচ করতে পেরেছিল মানুষকে বিচ্ছিন্ন না করতে পারলে এই ভাইরাসের বিস্তৃতি রোধ করা যাবে না। খানিকটা দেরিতে হলেও হুবেই প্রদেশ আর উহানকে বিচ্ছিন্ন করে সবাইকে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছিল। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল গোটা চীনের সব কারখানা। চীন গোটা রাষ্ট্রকে ছুটি দিয়ে নোভেল করোনা ভাইরাসের বিস্তার থামিয়ে দিয়েছে। এখন করোনার উৎপত্তিস্থল সেই হুবেই প্রদেশকে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। আর উহানকেও আগামী মাসের শুরুতেই খুলে দেয়া হবে। চীন যেমন সবকিছুকে ছুটি দিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ করেছে এখন গোটা বিশ্ব পারে কি না তাই দেখার বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস এ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস অবশ্য বলছেন শুধু লকডাউন বা ছুটি দিলেই হবে না। করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব নেতাদের এক হতে হবে। খবর জনকন্ঠ