করোনাভাইরাস: হটলাইনে ২৭৭৮ কল

13
Spread the love

বাংলাদেশের পাশে থাকবে ৩০ দেশ >২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ জনের নমুনা পরীক্ষা > নতুন কেউ আক্রান্ত হননি

বিশেষ প্রতিনিধি

করোনাভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। রোববার নিশ্চিত হওয়া গেছে বাংলাদেশেও থাবা বসিয়েছে করোনা। আক্রান্ত হয়েছেন দুই ইতালি ফেরত পুরুষ ও স্থানীয় এক নারী। এরপর থেকে বাংলাদেশেও করোনা নিয়ে চলছে নানা ঘটনা। সেসবই দেখে নেয়া যাক এক নজরে। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত হটলাইন চালুর পর আইইডিসিআরের কাছে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭৭৮ কল এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক আরও ১০ জনের নমুনা পরীক্ষা করেও করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। সবমিলিয়ে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নতুন কেউ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। আক্রান্ত তিনজনের অবস্থা ভাল রয়েছে। আর বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের থেকে পরিবারের বয়স্ক লোকদের সেলফ কোয়ারেন্টাইনে যাবার অনুরোধ জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফোরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারী হাসপাতালগুলোতে পৃথক করোনাভাইরাস ইউনিট প্রস্তুত করা হয়েছে। আর আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তক্রমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মাল্টিসেক্টরাল কমিটি গঠন হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের ৩০টি দেশ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে ।দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বনানীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে রাষ্ট্রদূতরা এ আশ্বাস দেন।

মঙ্গলবার মহাখালীর আইইডিসিআর ভবনে অনুষ্ঠিত নিয়মিত ব্রিফিংয়ে করোনাভাইরাসের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফোরা। এ সময় আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর উপস্থিত ছিলেন। ডাঃ সেব্রিনা ফোরা জানান, আক্রান্ত হয়েছেন এমন সন্দেহে বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা পর্যন্ত আইসোলেশনে আছেন এবং বিদেশের আক্রান্ত দেশ থেকে আগত যাত্রী যারা কোয়ারেন্টাইনে আছেন তাদের সংখ্যা ৫৬ জন এবং তাদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জনকে এমন অবস্থায় নেয়া হয়েছে। কল করে কি কি বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, করোনাভাইরাসের বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি মাস্ক কোথায় পাওয়া যাবে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে না, বিদেশ থেকে এসেছে, কি করণীয় ইত্যাদি জানতেও কল এসেছে।

অধ্যাপক ডাঃ সেব্রিনা ফোরা আরও জানান, আক্রান্ত তিনজন ছাড়া আরও আটজন আইসোলেশনে আছেন। যে তিন জন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন, তাদের মধ্যে দুই জনের মধ্যে মৃদু সংক্রমণ ছিল। তবে তাদের আমরা এখনই ছাড়তে পারব না। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী: পরপর দুইবার স্বাস্থ্য পরীক্ষাতে নেগেটিভ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসাধীন থাকতে হবে। তবে বাকি যারা আছেন, তাদের নিয়েও শঙ্কার কোন কারণ নেই।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, ইতালি থেকে আসা প্রবাসী বাঙালীদের কাছাকাছি এসেছেন এমন চারজনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আসা আরও বেশ কিছু ব্যক্তিকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে। তবে কতজনকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে, সে সংখ্যা তিনি জানাননি। মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সাতজনের নাক-মুখের লালা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে কেউ আক্রান্ত হয়নি। এর বাইরে, বিদেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের অনেককে আমরা সেলফ কোয়ারেন্টাইনে (স্বেচ্ছায়) থাকতে বলছি, তাদের অনেকে তা মানছেনও। ওই সেলফ কোয়ারেন্টাইনে যারা আছেন, তাদের আইইডিসিআরের হিসাবে ধরা হচ্ছে না।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, আমরা সিরিয়াসলি কাজ করছি। শঙ্কিত হওয়ায় কিছু নেই। আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বাংলাদেশী নাগরিকরা কিভাবে আছে, সেটা দূতাবাসের মাধ্যমে খোঁজ নিচ্ছি। তিনি বলেন, কুয়েতে মেডিক্যাল সার্টিফিকেটের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই। এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে। বিদেশ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এলে একটি ঘরে থাকুন। সেলফ কোয়ারেন্টাইন সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি। ইচ্ছেমতো বের হয়ে ১৭ কোটি মানুষকে বিপদে ফেলবেন না। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে মাস্ক ব্যবহার করে বের হবেন।

মীরজাদী সেব্রিনা ফোরা বলেন, ১২টি হটলাইন নম্বর দেয়া আছে। সবাই এখানে ফোন করে তথ্য নিতে পারেন। সচেতনতা ছাড়া প্রতিরোধের কিছু নেই। সঠিক পদ্ধতিতে হাত ধোয়া ও হাঁচি দিতে হবে। ডাঃ ফোরা আরও বলেন, এই ভাইরাস থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সবচেয়ে উত্তম পথ হচ্ছে সেলফ কোয়ারেন্টাইন। এই মারাত্মক ভাইরাস সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর আবারও গুরুত্বারোপ করে পরিচালক বলেন, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা অভ্যাস গড়ে তোলা ছাড়া এখন পর্যন্ত এই ঘাতক ভাইরাস থেকে রেহাই পাওয়ার কোন উপায় নেই।

প্রবাসী বাংলাদেশীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ডাঃ ফোরা বলেন, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, ইতালি ছাড়া অন্যান্য কোন দেশে এখনও পর্যন্ত কোন প্রবাসী বাংলাদেশী কোভিড-১৯ আক্রান্ত হননি। সিঙ্গাপুরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশী রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়নি, আরেকজন প্রবাসী বাংলাদেশীও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। দিল্লীতে উহান থেকে আগত ২৩ জন বাংলাদেশী নাগরিক দিল্লী শহর থেকে ৪০ মাইল দূরে একটি কোয়ারেন্টাইনে আছেন। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।

করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে ৩০ দেশ: বিশ্বের ৩০টি দেশ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে ।দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বনানীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে রাষ্ট্রদূতরা এ আশ্বাস দেন। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানান। বৈঠকে আমেরিকা, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, জাপান, ইতালি, ভারতসহ ৩০ দেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, বাংলাদেশের করোনা আক্রান্ত তিনজনের বিষয়ে রাষ্ট্রদূতদের জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে হাসপাতাল ও বাসা-বাড়িতে যাদের কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়েছে তাদের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। সরকার এই ভাইরাস মোকাবেলায় যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেগুলো সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে। সরকারের গৃহীত উদ্যোগে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, রাষ্ট্রদূতরাও নিজ নিজ দেশের করোনা পরিস্থিতি তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তারা বলেন, করোনাভাইরাস একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিনত হয়েছে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় সব রাষ্ট্র ও দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরষ্পরের পাশে থেকে চলমান এই বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। চীন, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালিসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা তাদের দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভিসা আদান-প্রদানে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে উপস্থিত রাষ্ট্রদূতদের বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন। বিদেশি কূটনৈতিক ও নাগরিকদের কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে কোথায়, কিভাবে যোগাযোগ করতে হবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সে সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতদের দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আমেরিকার রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার করোনাভাইরাস মোকাবেলায় তার দেশ বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন। আগামী দুই দিনের মধ্যে এই ভাইরাস মোকাবেলায় তিনি আর্থিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন। এছাড়া ইতালির রাষ্ট্রদূত সেদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।

১০০ কোটি চায় মন্ত্রণালয়, দ্রুতই বরাদ্দ: করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে অর্থ বিভাগ। শিগগিরই এই বরাদ্দ দেয়া হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

মানিকগঞ্জে কোয়ারাইন্টাইনে ৫৯ জন: করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এমন আশঙ্কায় মানিকগঞ্জে বিদেশ থেকে আসা ৫৯ জনকে নিজ বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় (হোম কোয়ারেন্টাইন) রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিদেশ ফেরত ব্যক্তিকে তাদের নিজ নিজ বাসায় বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। তারা বেশিরভাগই ইটালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদিআরব ফেরত বলে জানান মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন আনোয়ারুল আমিন আখন্দ।

নারায়ানগঞ্জে কোয়ারাইন্টাইনে ৪০ জন: নারায়ণগঞ্জে ৪০ জনকে নিজ নিজ বাসায় কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) ইতালিফেরত জেলার দুজন চিকিৎসাধীন। তারা এই ৪০ জনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। সে কারণেই তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তারা নিজ নিজ বাড়িতেই রয়েছেন। তাদের পাশে আইইডিসিআর’র কর্মকর্তা ছাড়া কাউকে ভিড়তে দেয়া হচ্ছে না। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা ১০০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল সার্জন আসাদুজ্জামান এ তথ্য জানান।

মানিকগঞ্জে এক পরিবারের ৫জন কোয়ারাইন্টাইনে: রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় ইটালিফেরত বাবা-ছেলেসহ এক পরিবারের পাঁচ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। তারা জঙ্গল ইউনিয়নের বাসিন্দা বলে বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম হেদায়েতুল ইসলাম জানান।

ইউএনও একেএম হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, গত ২ মার্চ বাবা ও ছেলে ইটালি থেকে দেশে ফিরেছেন। সোমবার বিষয়টি জানতে পেরে তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

স্কুল-কলেজ স্বাভাবিক: বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তের পর সবার মধ্যে কিছুটা ভয় কাজ করলেও ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মঙ্গলবার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে অন্যান্য দিনের মতো শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা গেলেও সতর্কতা হিসেবে অনেককেই মাস্ক পরে আসতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা বলছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দেবে তারা তা বাস্তবায়ন করবেন।